জীবন মানে….

* জীবন মানে যন্ত্রনা ; নয়  ফুলের বিছানা ; সেকথা

   সহজে কেউ মানতে চায়না –

* জীবন সেতো পদ্ম পাতায় শিশির বিন্দু;

   মরুভুমির বুকে যেন বিষাদসিন্ধু ;

   মনরে সেই জীবন নিয়ে কেন এত কান্না ;

   জীবনের পায়ে দিলি কেন এত ধর্না ;

* জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখো হিসাব নিকাশ

   কিছুই রবেনা ; লুকোচুরির এই যে খেলায়,  প্রাণের

   যত দেয়া নেয়া পূর্ণ হবে না।

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা ॥ দুই বাংলার স্বনামধন্য গীতিকারের কথাগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে অনুভূতি হয়ে অন্তর ছুঁয়েছে, একইভাবে স্থান কাল পাত্র ভেদে তাদের রাগ অনুরাগকে প্রভাবিত করেছে।

এসব গান শুনে সময় পার হয় কিন্তু জীবনের অর্থটা জানা হয়না। এনসাইক্লোপিডিয়ায় জীবন নিয়ে অর্থ, বাক্যের অভাব নেই। ভুরিভুরি তথ্য আছে। পরিপূর্ণ বলা যায়। কিন্তু সে সব শাস্ত্রকথাতেও কাজ হয়না। এর দর্শনগত দিক নিয়ে চিন্তা করলে এবং প্রতি বছরের শুরুতে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করালে জীবনের অর্থ খোঁজার একটা সুযোগ পাওয়া যায়। নিজকে বুঝা ও জানার প্রচেষ্টা একটি প্রক্রিয়া। সত্যমানুষ বলেছেন – নিজের বিচার নিজে কর রাত্র দিনে। নিজেকে নিয়ে কিছুটা সময় ব্যয় না করলে কিভাবে সম্ভব এই অসম্ভব কে জানার? কারও সাধ্য নেই।  দিনে দিনে বেলা বয়ে যায়, বয়স বাড়েনা প্রকৃতপক্ষে বয়স কমে। একদিন বয়সের একপ্রান্তে এসে চুলচেরা হিসাব করলেও প্রশ্নের উত্তর মেলেনা। দেখা যায় অনেকটা উদ্দেশ্যবিহীন জীবনই জীবনের উদ্দেশ্য হয়েছে। কেন এই জীবন?  এটাই কি সেই জীবন যা আমি চেয়েছিলাম? প্রশ্ন গুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যার দর্শন জানতে হলে গভীরে যেতে হবে এবং বাস্তবতার নিরিখে আমরা যেভাবে জীবন যাপন করছি সেখানেই এর অর্থ লুকিয়ে আছে। আসা আর যাওয়ার মধ্যেই কি সব কিছু?

যদি এটাই সত্যি হয় তাহলে জীবন মানে কি এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা দরকার। থেমে গেলে উত্তর আসবেনা। অনুশীলন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলে উত্তর পাওয়া সম্ভব। মনে রাখতে হবে এটা অনুশীলন। এই অনুশীলন প্রাত্যাহিক জীবনের ঘটনা প্রবাহ থেকেই নিতে হবে। বাইরের পৃথিবী এর সহায়ক শক্তি হবে মাত্র।

দর্শনগত অনুশীলন একজনকে দীর্ঘায়ু দিতে পারে। জীবনকে ভালবাসতে শেখাতে পারে। এই অনুশীলন একজনকে একটি সুস্থ্য জীবনের সন্ধান দিতে পারে। সমীক্ষায় দেখা যায়, নিজ জীবনের সুখানুভূতি, ভাললাগা ভালবাসা, সৃজনশীলতা এবং চারপাশের পরিবেশকে একটি আনন্দময় জগত গড়ে তোলার মধ্যে জীবনের অর্থ ও এর উদ্দেশ্য খুঁজে পায় অনেকেই। নিজস্ব স্পষ্ট অভিব্যক্তি, ভাবধারা তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে তারা। তখন এটিই হয়েছে তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখনই নিজস্ব ভাবধারা সৃষ্টি হয়েছে, তখনই সম্ভব হয়েছে সৃজনশীলতার পথ ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এছাড়া বিকল্প কোন পথ বোধকরি নেই।   জীবনের উদ্দেশ্য কি? একটি সিদ্ধান্ত নেয়া পরবর্তীতে কি করণীয় বা কি করতে হবে? যে কারণ, যে অর্থ নিজের কাছে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য।  সর্বসম্মতি শব্দটার অর্থ গভীর। সত্যমানুষ সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন- ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র দিনে’। নিজেকে বাদী বিবাদী, সাক্ষী, আসামী , উকিল এবং  বিচারক  এতগুলো রূপ একত্র করলে একের মধ্যে বহুর বিচরণ ঘটে। এজন্য দরকার নিজের জন্য সময় নির্ধারণ। সবকিছু ছেড়ে বনে জঙ্গলে গিয়ে নিরিবিলি পরিবেশ খোঁজার মানুষ সকলে না। সাধারণদের জন্য চিন্তার বৈচিত্রতার ভিতর দিয়ে প্রশ্নের সমাধান দিতে হয়। সম্পদ, ভাল স্বাস্থ্য, সন্তান, নাম যশ, খ্যাতির মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্য কতখানি থাকতে পারে তা ব্যক্তির অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়।

উদ্দেশ্য বিষয়টা পরিকল্পনা করা এবং তা সফল করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করার মত ক্ষমতা অর্জন করার সামর্থ থাকার ব্যাপার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সময়ের ব্যবধানে জীবনের উদ্দেশ্য পরিবর্তন হয়। যা পর্যবেক্ষণ করলে আনন্দ পাওয়া যায়। এটা বুঝতে অন্তর্দৃষ্টি লাগে। এজন্যই বলা হয় আত্মিক। দার্শনিক প্লেটো প্রেমকে উন্নত জীবনের জন্য আলো এবং একটি অগ্নিসংকেত হিসাবে অভিহিত করেছিলেন। একটি উঁচু টাওয়ারের মাথায় বসানো প্রজ্জলিত আগুন যেমন পথ দেখায় তেমনি জীবনের জন্য প্রেমকে সেভাবে দেখেছেন। রাশিয়ান লেখক লিও টলস্টয় জীবনের উদ্দেশ্য- মানবতা ও সেবার মধ্যে পেয়েছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন একটি অর্থবহ জীবন খুঁজে পেয়েছেন- অপরের জন্য একটু ভাবনার মধ্য দিয়ে। মার্টিন লুথার কিং প্রশ্নের মধ্যে খুঁজেছেন জীবনের উদ্দেশ্য। তুমি অপরের জন্য কি করছো? বিখ্যাত চিন্তাবিদগণ তাদের জীবনটাকে দেখা নয়,পর্যবেক্ষণ করেছেন গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।  বৃক্ষ রোপণ, কথামালা দিয়ে, সান্নিধ্য, সৃজনশীলতা, গান রচনা, সহমর্মিতা, অন্যের জন্য মঙ্গল চিন্তা এরকম বহুবিধ ধারাায় আলো সৃষ্টি করা যায়, যে আলোয় অন্যরা এগিয়ে যেতে পারে।

নিভৃতে নিরালায় বসে নিজস্ব কোন সময়ে নিজকে প্রশ্ন করলে উত্তর হয়তো আসবে। জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে উদ্দেশ্যের জীবন। যখন কেউ উদ্দেশ্য স্থির করে, তখন তা বাস্তবায়ন করার জন্য পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের  ধারায় চলার পথটি মসৃণ করতে হয়। উদ্দেশ্যের জীবন থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ এর পিছনে কেউ লেগে থাকে। না থাকলে সেটা হয়ে যায় মৃত। সেই পরিকল্পনায়  নিজস্ব অভিব্যক্তি, নিজস্ব রচনা, নিজস্ব কাব্য এবং নিজকে নিয়ে একটি উপন্যাস তৈরির বিষয় জড়িত। এ জীবনটা কি? এর অর্থ কি? এর উদ্দেশ্য কি এই প্রশ্ন নিয়ে একটু সময় চেয়ে নিজেকে দিতে পারলে উত্তর আসবে জীবনের আসলে প্রকৃত অর্থটা কি? যে পরিকল্পনা, যে কথা থাকছে নিজের কাছে প্রতিবছর শুরুতে তার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সময়ের ফেরে উত্তরে বৈচিত্রতা আসছে। তাই রিভিউ বিষয়টা ভুলে গেলে চলবেনা। জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা সেই অর্থকে কখনও প্রভাবিত করছে, কখনও অনুপ্রাণিত করছে। নিজকোষে তথ্য জমা হচ্ছে। নিজের জন্য বার্তা থাকছে। এটাই আত্ম-উপলব্ধি।

নিজের মধ্যে নিজ আবিস্কার, কোন কিছু পাওয়ার জন্য বা অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা, অথবা এমন কিছু কর্ম যাতে আনন্দ পাওয়া যায়। যেখানে আনন্দ থাকে সেখানে কর্মের প্রতি ভালোলাগা থাকে। আগ্রহ থাকে। নিবিড়তা থাকে। সৃষ্টির উল্লাস থাকে।  জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজতে গিয়ে যখন প্রেম প্রাধান্য পায়,তখন নিজকে সর্বপ্রথম ভালবাসতে হবে, এরপর চারপাশের বিরাজমান প্রাণের মধ্যে প্রেম, পরিবেশ এবং মানসিকতা তৈরি করতে হবে। অপরের প্রতি সহযোগিতা সহমর্মিতা প্রাধান্য পায়, তবে নিজ আঙ্গিনায় এবং এরপর আঙ্গিনার বাইরে একথার প্রভাব থাকছে কিনা তার দেখার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। জীবনের অভিজ্ঞতা মর্মস্পর্শী হলে সে অভিজ্ঞতা থেকে ইতিবাচক দিক আবিস্কার করার দায়ও নিজের। যে ক্ষীণ আলো পাওয়া যাবে তাতেও অন্ধকার কাটবে। আর বেঁচে থাকার মধ্যে কোন আশীর্বাদ খুঁজে পেলে সেখানে কৃতজ্ঞতা থাকবে। কৃতজ্ঞতা মানুষকে স্থিত করে। একটা শান্ত অবস্থাই মূলত শান্তির অবস্থান। বলতে গেলে পুরো বিষয়টা ব্যবহারিক প্রক্রিয়া। জীবনের মানে বের করার জন্য একটা ছোট পদক্ষেপ নিজের দিকে ফেললে তা আরও অর্থবহ হয়।

ইতিবাচক ফলাফল হলে মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ী উজ্জীবিত হয় আর বিপরীত হলে গ্রহণ করতে চায়না। দুটোই অর্থ বহন করছে। যে দিকে যায়  বা প্রাধান্য দেয় তার পরবর্তী চলার পথ সেভাবে রচিত হয়। এটাই নিয়ম। সুতরাং গীতিকারের কথা দিয়ে, কবির কাব্য কবিতার বাক্য দিয়ে কারও জীবনের  উদ্দেশ্য জানা সম্ভব নয়। সাধক, চিন্তাবিদ, গীতিকার, কবি এঁরা একেকজন প্রথমে একজন মানুষ হিসাবে এই পরিবারে সমাজে বিরাজ করেছেন এবং করেন। তাঁরা যা বলেন নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা বলেন। নিজের কথা বলেন। সেই জীবনের উদ্দেশ্য আলো সৃষ্টি করে মাত্র কিন্তু অন্ধকারে বাকী পথটুকু চলতে হবে ব্যক্তিকেই। সৃষ্টির করার সামর্থ অর্জন করতে হয় নিজেকেই।