জি-টোয়েন্টি মঞ্চে ক্ষমতার হাসি

g2

সংলাপ ॥ রতনে রতন চেনে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভ্লাদিমির পুতিনের জুটি অবলীলাক্রমে একের পর এক আপন রেকর্ড ভাঙিয়া চলেছেন। দু’বৎসর আগে ওয়াশিংটনে এক বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের দেখিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এরাই বুঝি আপনাকে অপমান করেন?’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জবাব দেন নি, স্বভাবসিদ্ধ মুখভঙ্গি করে হেসেছিলেন, সেই মুখব্যাদানে যোগ দিয়েছিলেন পুতিন। তার পরে দু’বছর কেটে গেছে, অশোভন কথা ও ভঙ্গির বহু অনুশীলনে অভ্যাস আরও অনেক জমেছে। বিশেষত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণবিধি নিয়ে আজ আর নূতন করে অবাক হবার কোনও প্রশ্ন নেই। জাপানের ওসাকা শহরে জি-২০ দেশগোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে তিনি আবারও, পুতিন সহযোগে, নূতন কীর্তি স্থাপন করলেন। দু’নেতা সাংবাদিকদের মুখোমুখি বসবার পরেই রুশ নায়কের দিকে চেয়ে তার মন্তব্য: ‘ওদের নিকেশ করা যাক। মিথ্যা সংবাদ (ফেক নিউজ) দারুণ ব্যাপার। আপনার তো এই সমস্যা নেই।’ এক মুহূর্ত চুপ করেই পুতিনের জবাব, ‘আমাদেরও ওই সমস্যা আছে, একই সমস্যা।’ অতঃপর দুই জনের অর্থপূর্ণ যুগ্ম-হাস্য।

এই বদ-রসিকতার যুগলবন্দি কেবল কুরুচির পরাকাষ্ঠা নয়, গভীর উদ্বেগের কারণ। ট্রাম্প তার দেশের স্বাধীনচেতা ও প্রশ্নবাচী সাংবাদিকদের উঠতে বসতে গালি দেন, তাদের ‘জাতির শত্রু’ বলে নিন্দা করেন, কোনও সংবাদ, এমনকি প্রমাণিত তথ্যও তার অনুকূল বা মনোমতো না হলে মিথ্যা সংবাদ বলে উড়িয়ে দেন। (যদিও নিজে নিরন্তর এমন বহু কথা বলে চলেন যা কেবল অসত্য নয়, সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।) কিন্তু পুতিনের সাথে তার এই বিচিত্র আলাপের ঘটনায় উদ্বেগের একটি বিশেষ মাত্রা নিহিত রয়েছে। পুতিনের রাশিয়ায় সাংবাদিকরা কেবল মৌখিক গালি বা রাষ্ট্রীয় ঘৃণার লক্ষ্য নহেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা সে দেশে স্বৈরতন্ত্রের- আক্ষরিক অর্থে- শিকার। গত সিকি শতাব্দীতে পুতিন-ভূমিতে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা অর্ধশত ছেড়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার মাপকাঠিতে বিন্যস্থ তালিকায় রাশিয়ার স্থান একেবারে নীচের সারিতে। এ হেন এক নেতার সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের সম্মুখে ‘ওদের সরিয়ে দেবার’ কথা নিয়ে রসিকতা করেছেন- এ দৃশ্য দেখে লিবার্টি-র প্রতিমূর্তি পারলে চোখে আঙুল দিতেন নিশ্চয়ই। অবশ্য এটাও ঠিক নূতন নয়। তিন বছর আগে ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে ‘বেয়াড়া’ সাংবাদিকদের খুনের হুমকি দিয়েছেন, যে সাংবাদিকরা মানবাধিকারের কথা বলেন তাদের ‘গুপ্তচর’ আখ্যা দিয়েছেন, এবং তা শুনে ট্রাম্প হেসেছেন। ক্ষমতার হাসি অতি ভয়ঙ্কর বটে। তবে, মানতেই হবে, পুতিনের সৌভাগ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঈর্ষান্বিত হবার বিলক্ষণ কারণ আছে। তাকে মার্কিন গণতন্ত্রের দায় বহন করতে হয়। আধুনিক রুশ ‘জার’-এর সেই সমস্যা নেই, তিনি একাধিপতি, জি-২০ বৈঠকের পূর্বলগ্নে সাক্ষাৎকার দিয়ে সাফ সাফ বলতে পারলেন: উদার গণতন্ত্র অচল, বিভিন্ন দেশে যে অনুদার পপুলিজম-এর অভিযান চলছে, তাই ভাল। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চয়ই মনে মনে আক্ষেপ করেন, আমি কেন পুতিন হলাম না।

অপরদিকে, জি-টোয়েন্টি মঞ্চে কূটনীতিতে ভারতের ছিল ‘সোবার পারফরম্যান্স’। গত জুন ২৭-২৯-তিন দিন ব্যাপী জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠিত হলো জি-টোয়েন্টি সম্মেলন। তিন দিনে ২০টির বেশি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের রেকর্ড করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি।

আশা-আশঙ্কার দোলাচলে ভারত ভেবেছিল বৈঠকে শামিল হওয়াটাই হবে একটা পজেটিভ বার্তা দেয়া। কারণ চীন মার্কিন বাণিজ্য-সংঘাত, যা থামার কোনও উল্লেখযোগ্য লক্ষণ ছিল না। আশঙ্কার ছিল, চীন বাণিজ্যে যত সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠবে ততই সে নিজের আধিপত্য ক্ষুদ্রাকার রাষ্ট্রগুলির উপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করবে। এতে কেবল মুক্ত বাণিজ্যই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা, পছন্দ ও উদারনীতিবাদের পরিসরটাই বেমালুম হারিয়ে যেতে পারে। আশঙ্কার আরেক হেতু অবশ্যই ডলারের বিকল্প বিনিময় মুদ্রা আনতে চীনের তৎপরতা এবং তার সঙ্গে বেল্ট এন্ড রোডের পরিকল্পিত যোগসূত্র।

প্রসঙ্গত বাঁধা বুলির জায়গা থেকেই ট্রাম্প চীনের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এমনকী তার যুক্তি হল সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার আওতায় সমৃদ্ধি লাভ অপেক্ষা স্থবিরতা বরং শ্রেয়। তবে এই পারস্পরিক আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের আঁচ সামলে যদি আমরা স্থির ও খোলা মনে দেখার চেষ্টা করি তাহলে দেখব, যে বিশ্ব অর্থনীতি সংকটপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজারনির্ভর নয়া-উদারনৈতিক ব্যবস্থার যে সংকট তা আদতে পশ্চিমি শক্তিসমূহের কাছে অশনিসংকেত, অর্থনৈতিক সংকটে ঘায়েল হলেও এশিয়ার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে তার নিজস্ব শক্তিতে। উপরন্তু চীনের উত্থান প্রমাণ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে পশ্চিমি শক্তি জোট একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণে অক্ষম। তাই বিশ্ববাজারে বৃদ্ধির গ্রাফ দ্রুত নিম্নগামী। সংকট সামলে বৃদ্ধির চাকা যে আবার গতিশীল হবে সে সম্ভাবনাও দূর অস্থ। অবস্থার আশু উন্নতি না হলে অর্থনীতিতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির করাল ছায়া ঘনিয়ে আসবে একপ্রকার তা নিশ্চিত। অর্থনীতিবিদদের মতে বিশ্বায়নের দরুন চীন-মার্কিন বাণিজ্য সংঘাতের প্রভাব পড়েছে আপাত সমৃদ্ধিশালী সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলির অর্থনীতির ওপরেও। ইউক্রেন ও ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার হস্থক্ষেপের পর থেকে অনেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র, বিশেষত বান্টিক রাষ্ট্রগুলি নিরাপত্তার সংকটে ভুগছে। এমতাবস্থায় ট্রাম্প ইউরোপের সুরক্ষায় কতখানি আগ্রহী তা স্বয়ং তিনিও জানেন না! গোদের উপর বিষফোড়া ২৪ জুন থেকে ইরানের উপর আমেরিকার আরেক প্রস্থ নিষেধাজ্ঞা জারি ।

জি-টোয়েন্টি কি পারবে এই জটিল ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক জাঁতাকল থেকে বিশ্বকে মুক্ত করতে? পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে ১৯টি বৃহৎ ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে নিয়ে জি-টোয়েন্টির উদ্ভব হয়েছিল তদানীন্তন অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে। এর পিছনে ছিল দুটো প্রধান কারণ: (১) মেক্সিকো থেকে যে সংকট শুরু হয়ে আমেরিকায় আছড়ে পড়েছিল তার নিরসনে পশ্চিমি উন্নত অর্থনীতিগুলি ছিল অপারগ। (২) ভবিষ্যৎ সংকটের মোকাবিলা করার জন্য যথাযথ তাল-মিল ও মেকানিজম গড়ে তোলা । বস্থুত: জি-টোয়েন্টির মধ্যে যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমি শিল্পোন্নত রাষ্ট্র রয়েছে, তেমনি চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সম্ভাবনাপূর্ণ রাষ্ট্রও রয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে এই ফোরামটির বার্ষিক অধিবেশনের কার্যকলাপ নতুন আশার বার্তা ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। সংকটকালে তারা রিকভারি প্ল্যান তৈরি করতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার থেকে প্রয়োজনে অর্থ তোলার অধিকার, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাঙ্কগুলি যাতে প্রয়োজনীয় ধার দিতে পারে তার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা, আন্তর্বাণিজ্যকে জোরদার করা এবং দরিদ্র রাষ্ট্রগুলির জন্য বিশেষ ছাড় দিয়ে অর্থ মঞ্জুরির ব্যবস্থা করা-সামগ্রিকভাবে যাতে উৎপাদনশীল ক্ষেত্রগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় এবং সেইসঙ্গে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে প্রণোদিত করা। চীনের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সাফল্যের চাবিকাঠি হল ডলারের সাপেক্ষে চীনা মুদ্রার বিনিময় মূল্যের হ্রাস এবং মজুরি বেঁধে দেওয়া, যাতে করে রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়। কিন্তু চীনের এই একতরফা সুবিধা যে সামগ্রিক স্বার্থের অনুপন্থী নয়, সেদিকে নজর দেওয়ার জন্যে জি-টোয়েন্টির বিবর্তনের মধ্যে প্রতীয়মান হয়ে উঠছে। তাই বর্তমানে জি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তার কারণ তার বৃহত্তর অঙ্গন, যা বহুপাক্ষিক আলোচনার মুক্তমঞ্চ। সেইসঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক মিলন তথা বৈঠকের আদর্শ প্ল্যাটফর্মও বটে। বৈঠকের অবসরে মোদি সৌদি প্রিন্স, রাশিয়ার পুতিন, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, এমনকী কানাডার রাষ্ট্র প্রধানদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

ফল নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু এমন সৌহার্দপূর্ণ সাক্ষাতের সুযোগ কিন্তু দুর্লভ। সেই সঙ্গে সংকীর্ণ অর্থে জি-টোয়েন্টি কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকেশ বা দর কষাকষির মঞ্চ নয়। বর্তমানে রাষ্ট্রপ্রধানদের অন্তর্ভুক্তির দরুন এর রাজনৈতিক তাৎপর্য প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা যায়, বিশ্বে বিদ্যমান ক্ষমতা ভারসাম্যের উপর জি-টোয়েন্টি দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষণীয় জি-টোয়েন্টি কোনও আমলাতান্ত্রিক গ্রুপ নয়, কোনও হেডকোয়ার্টাস ছাড়াই সে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে চলেছে। সহমতের ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত হয় তার রূপায়ণ সদস্যদের উপর চাপিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে না। জি-টোয়েন্টির মঞ্চকে সব সদস্য রাষ্ট্রই সদ্ব্যবহার করতে আগ্রহী। বিশ্বব্যাপী জিডিপি-র ভাগের দিক থেকে জি-টোয়েন্টি অনেকখানি এগিয়ে জি-টোয়েন্টি বেড়াজালে আবদ্ধ আপাত সুরক্ষিত জাতীয় অর্থনীতির থেকে মুক্ত বাণিজ্যের সমর্থক। ট্রাম্পের আমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতই অসহিষ্ণু, আক্রমণাত্মক ও একতরফা পদক্ষেপ করবে, ততই তাকে বাকি সদস্যদের কছে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হবে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী মনোভাব যত প্রবল হবে ততই রাশিয়া চীন শিবির নতুন অক্সিজেন পেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

আগামী দিনে বিশ্বরাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটলে, ভারতকে বাদ দিয়ে জি-টোয়েন্টির কোনও নতুন সংস্করণও গড়ে উঠতে পারবে না। ভারতের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি গড়ে দিয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং। নরেন্দ্র মোদির সেই ক্যারিশ্মা না থাকলেও বৈদেশিক ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা পালনের পটুত্ব তার রয়েছে। তাই জি-টোয়েন্টির মঞ্চকে ব্যবহার করে সরাসরি অর্থনৈতিক কচকচির মধ্যে না ঢুকে তিনি ঘুরিয়ে বার্তা দিলেন ভ্রষ্টাচার রোধের চেষ্টার উপর গুরুত্ব দিয়ে।