জনপ্রতিনিধিরা সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের গুরুত্ব বুঝবেন কবে?

সংলাপ ॥ শুধু নিজের কথাটা বলব, বলা শেষ হলেই সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দেব। যে কথাটা বললাম, তার পাল্টা-ও কারও কিছু বলার থাকতে পারে, কারও কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে বা অসন্তোষ থাকতে পারে ভাববই না এসব। পাল্টা কিছু শুনতে আমি প্রস্তুত নই, কোনও অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে রাজি নই, অসন্তোষকে গুরুত্বই দিই না। নিজের কথাটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সবাইকে শুনিয়ে দিয়েছি সেখানেই কথা শেষ। অন্য কারও কথা শুনবই না। রাজনীতিকদের আচরণ এবং মানসিকতা এখন এ রকমই।

রাজনৈতিক ক্ষমতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যও বোধহয় বাড়ে। কিন্তু সেই ঔদ্ধত্যের এমন বেপরোয়া প্রকাশ বিপদটাকে বাড়াচ্ছে। আগে কোথাও একটা সৌজন্যের বা লোক দেখানো বিনয়ের আব্রু ছিল। এখন সে আব্রুটাও উধাও হয়ে যাচ্ছে রাজনীতিকদের আচরণ থেকে।

গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিকে জনতার কাছে জবাবদিহি করতেই হবে। জবাব দিতে দায়বদ্ধ তারা। জনতা সরাসরি প্রশ্ন পৌঁছে দিতে পারেন না রাজনীতিকদের দরবারে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে সংবাদমাধ্যম রাজনীতিকদের সামনে তুলে ধরে জনতার প্রশ্নগুলো। সে প্রশ্নের জবাব দেওয়াটা রাজনীতিকদের জন্য আবশ্যিক। কিন্তু তারা সে সব শিক্ষা ভুলে যাচ্ছেন এবং অগ্রাহ্য করছেন। সমস্যাটা সেখানেই।

চার দিকে এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত যদিও পুরো দেশ ও বিশ্বজুড়ে বিশ্বপ্রকৃতি ও রাজনীতির নানা মেরুকরণে আপাত টালমাটাল সব। তবুও ঢাকা পড়ছে না অস্বীকৃতি ও আক্রমণের তীক্ষè নখদন্ত। একবিংশ শতকের বাংলাদেশে রক্ষণশীল অন্ধকার পার হয়ে যেন মুক্তির আলোকে প্রবেশ করছে। কী বলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজ? রাজনৈতিক সমাজ বৃহত্তর সমাজেরই একটা অংশ, তেমনই একথাও তো ফেলে দেবার মতো নয় যে জনপ্রতিনিধিরা জনতার অপেক্ষা অধিক বিবেচনা সম্পন্ন হবেন, এমনটাই স্বাভাবিক। সেই বিবেচনায় সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক অধিকারের গুরুত্ব তারা বুঝবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, দেশের রাজনৈতিক সমাজ অতখানি আগাতে নারাজ। এদেশের রাজনীতিকরা তাদের পিছনের বিরাট সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের অন্ধতাতেই ভর দিয়ে দাঁড়াতে চান। যতই নাগরিক অধিকার ও দেশের প্রকৃত উন্নয়নের বিষয় সামনে আসছে, বৈদ্যুতিন ও সামাজিক মাধ্যমে বাড়ছে আজগুবি গল্প, আর রাজনীতিকদের আস্তিন থেকে বেরোচ্ছে নানা রকম নোংরা তুরুপের তাস !

ধর্মীয় বিশ্বাস প্রত্যক্ষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে রাজনীতিতে, তা বোধহয় আগে কেউ ভাবতে পারেননি। ধর্মীয় বিশ্বাস যে কোন ব্যক্তির নিতান্ত ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে নেতার ধর্মীয় বিশ্বাস স্পষ্ট করে সর্বসমক্ষে তুলে ধরা খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্ভবত। রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে না আনলে যেন রাজনীতিকদের রাজনীতি জায়েজ হয় না!

রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক এত নিবিড় হবে কেন? কেন ধর্মকে টেনে এনে রাজনীতির মাঠ গরম করা হয়? কি এত মধু রয়েছে এতে যে তা রাজনীতিতে না থাকলে নতো হওয়া যাবে না বা ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না? বাংলাদেশের রাজনীতিকরা কি চীন রাশিয়ার দিকে তাকায় না? নেতা কবে কোথায় গেলেন, তা নিয়ে রাজনীতির খুব বেশি আগ্রহ থাকবে কেন? অন্য যে কোনও ব্যক্তির মতো মন্দির, মসজিদ, গির্জায় যাওয়া রাজনৈতিক নেতারও ব্যক্তিগত অধিকার। তিনি কোথায় যাবেন, কোথায় যাবেন না, তা তিনি নিজেই স্থির করবেন। এ নিয়ে অন্য কারও কিছু বলার থাকতে পারে না। বর্তমান বাংলাদেশে উল্টোটাই যেন ঘটছে। কট্টরবাদীরা এই রাজনীতিই চাচ্ছে। কিন্তু সেই ফাঁদে কোনও দলের পা দেয়া বেমানান লাগে। তাছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যদি স্মরণ রাখেন দেশ ও দেশের জনগণের সাথে কৃত শপথের কথা তবে এই স্বার্থলোভী কপট রাজনীতির বাইরে এসে নিজেদের জনপ্রতিনিধির মান মর্যাদা বজায় রাখার এটাই এক সুবর্ণ সুযোগ।

পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনীতি কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অনেক বেশি পরিপক্কতা এবং পরিমিতি বোধের পরিচয় দেয়। নেতার ব্যক্তিগত জীবন বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে সচরাচর রাজনীতির সঙ্গে জড়ানো হয় না ওই সব দেশে। কিন্তু আমাদের দেশে ইদানীং উল্টোটা হচ্ছে। রাজনীতির জন্য এ মোটেই খুব স্বাস্থ্যকর লক্ষণ নয়। নিয়ম ভাঙার খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরে বিশ্বে রাজনীতির চেহারাটা অনেকখানি বদলে দিয়েছেন। তবু ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টাটা এখনও বেশ সচেতন ভাবেই বিদ্যমান সমগ্র বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র কেবল এদেশে!

আবার বোধহয় ‘মানুষের জয়’ সূচিত হচ্ছে। ধাপে ধাপে ‘জিততে জিততে’ বোধহয় ‘গণতন্ত্র’ এবার তার চূড়ান্তÍ জয়ের দিকে এগোচ্ছে। এমন ‘মহতী’ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কিছু ‘বলিদান’ তো দিতেই হবে।

দেশে সত্যের শিকড় যত মজবুত থাকে, গণতন্ত্রও সেই হিসেবে প্রসারিত হয়। আবার গণতন্ত্রের প্রসার সমানাধিকারের পূর্বশর্ত। সমাজের সবচেয়ে নিপীড়িত, অবহেলিত মানুষদের সহ-নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করানোর সংগ্রাম ও পরিচয় গড়ে দিয়েছে, সত্য ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সেই লড়াইয়ের যোগই সবচেয়ে বেশি। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং ফ্যাসিবাদী কর্মসূচির কারণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত মিথ্যাচার রাজনীতিতে স্বাভাবিক অগ্রাধিকার পেয়েছে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নিম্নবর্ণ, নারী এবং আর্থিক শ্রেণিবিভাজনে দরিদ্র। তা সত্ত্বেও সত্য ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে জাতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি থেকে গিয়েছে।

আওয়ামী জোটে যদি নীতির প্রশ্নটাকে আরও বড় করে তুলে আনা যেত, অর্থাৎ, মানুষের কাছে যদি এই বার্তাটা স্পষ্ট ভাবে পৌঁছে দেয়া যেত যে, এই জোট ক্ষমতা দখলের জোট নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা, সত্য এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য এক আন্দোলনের সূচনা, তা হলে হয়তো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনেকটাই ভাল ফল পেতে পারত। অনেক কিছু করেও যা আজ অর্জন করা যাচ্ছে না।

পথ কণ্টকাকীর্ণ। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ডে বর্ষণের নিশ্চয়তার চেয়ে সন্দেহের উপাদান বেশি। দেশ ও দেশের মানুষের সাথে হাজার প্রতারণা করেও আস্ফালন করা অগ্রসরমান রাজনীতির পরিপন্থী তো বটেই, সেই সঙ্গে এটি বাঙালিত্ব নামক ধারণাটার প্রতি তাদের বিশ্বস্ততার পরিচায়কও নয়। যারা স্বৈরতন্ত্রে দেশে শাসন চালিয়েছেন তাদের বোঝা উচিত স্বৈরতান্ত্রিক পথে লড়াই চলে না। সে পথটা গণতান্ত্রিক, অধিকতর গণতান্ত্রিক। আর প্রকৃত গণতন্ত্রেই রয়েছে জাতি হিসেবে বাঙালির উত্তরণের পথ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যত দ্রুত তা অনুধাবন করবেন ততই তা দেশ ও জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে।