ছাব্বিশ বাঙালী, জর্জ ফ্রয়েড একটি গর্ভবতী হাতি ও একজন সাহাবউদ্দীন

হাসান জামান টিপু 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী মানুষ বিভিন্ন দেশ হয়ে কান্খিত দেশে আশ্রয় নেয়। সাদারা এশিয়া, আফ্রিকা অস্ট্রিয়ায় গিয়েছে, ভুমিপুত্রদের তাদের দাস বানিয়েছে, ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করেছে, খুন, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ করেছে পরিবেশ ধ্বংস করেছে। কেউ গিয়েছে যোদ্ধার বেশে, কেউ বণিক হয়ে, কেউ গিয়েছে বাইবেল হাতে। উদ্দেশ্য একটাই দখল, প্রভূত্ব। সবাই নিজ দেশে কিছু করতে না পেরে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। 

দ্বিতীয়, মহাযুদ্ধের পরে সাম্রাজ্যবাদী এই বিস্তার একসময় থেমে যায়, আসে অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তীতে মানুষ বিভিন্ন দেশে মাইগ্রেট করতে থাকে, তৃতীয় বিশ্ব থেকে লোকজন নানান কায়দায় ইউরোপ, আমেরিকায় যেতে থাকে। কমিউনিস্টদের পতনের পর আশি নব্বই দশকগুলিতে এদেশের মানুষ ব্যাপকহারে ইউরোপ আমেরিকায় যেতে থাকে। তুরস্ক, রাশিয়া, রুমানিয়া, লিবিয়া হয়ে বাঙালিরা জীবনবাজী রেখে বিভিন্ন পন্থায় দালালের মাধ্যমে পাড়ি দিতে থাকে। এটা নিরন্তর প্রক্রিয়ায় মানুষ তার ভাগ্যান্বেষণে দেশান্তরি হতে থাকে, এটা দেশের ভিতরে ও বাইরে হয়ে থাকে। 

কিছুদিন পূর্বে লিবিয়ায় ছাব্বিশ বাংলাদেশীকে দ্রোণ দিয়ে গুলি করে মারা হলো। ভাগ্যবিড়ম্ভবনায় ছাব্বিশ জন মানুষ বলি হয়ে গেল। তাদের দোষ ছিলো তারা ভাগ্যকে বদলে দিতে চেয়েছিলো, দেশে তাদের ভাগ্যকে কোন ভাবেই পরিবর্তন করতে পারছিলো না। কাকে দোষ দিব এই ছাব্বিশ প্রাণ সংহারের জন্য? সরকার কে? সিস্টেম কে?নাকি বিধাতাকে? আমাদের পত্রপত্রিকায়, চিন্তায়, আমাদের চেতনায়, আমাদের লেখায় তাদের কথা তাদের জন্য সমবেদনা দৃষ্টিকটুভাবে কম হয়েছে। কেন হয়েছে? 

গত পঁচিশে মে আমেরিকার মিনিয়াপোলিস অঙ্গরাজ্যের পুলিশ একটি রেস্তোরাঁর ৪৬ বয়স্ক কালো নিরাপত্তা কর্মী জর্জ ফ্লয়েডকে একটি সন্দেহজনক প্রতারণার মামলায় গ্রেফতার করে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দশ মিনিটের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় একজন সাদা পুলিশ অফিসার জর্জের ঘাড়ের উপর হাঁটু দিয়ে চেপে আছেন। জর্জ বার বার বলছিলেন, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। তবুও তাদের দয়া হয়নি। এতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু হয়। এতে গোটা আমেরিকা জুড়ে বিক্ষোভ, লুটতরাজ শুরু হয়, বিশ্ব জুড়ে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠে। আমেরিকায় পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। 

আমেরিকার মতো অগ্রসর একটা দেশে যেভাবে বর্ণবাদকে লালন করা হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যে দেশে প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা, একজন ইমিগ্রেন্ট আফ্রিকান সে দেশে বর্ণবাদের গোড়া এতো গভীরে প্রোথিত এটা বুঝা যায়নি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসে উগ্রজাতীয়তাবাদী তথা হোয়াইট সুপ্রিমেসির জোড়ে। এটা একটা সময় আমেরিকার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের ট্রাম্পের নির্বাচনী বক্তব্যে ও নির্বাচনের পরে পরেই বুঝা গিয়েছিলো।  আজকের এ অবস্থা  ট্রাম্পের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফসল। আগামীতে আমেরিকাকে বর্ণবাদের জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হবে। 

ফেণীর সোনাগাজী উপজেলার একজন সাহাবউদ্দীন পেট্রোল পাম্পে সামান্য বেতনে কাজ করে। হঠাৎ তার জ্বর, সর্দি ও শ্বাস সে তার বাড়ী গেল। একজন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো তার বাড়ী। সে বাড়ীতে যাওয়ার সাথে সাথে তাকে একটি কক্ষে তালা দিয়ে রাখা হয়, তার জ্বর ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। সারারাত সে পানি ও খাবারের জন্য কান্নাকাটি করে। কেউ এগিয়ে আসেনি। অবশেষে তালাবদ্ধ রুমে তার মৃত্যু হয় অত্যন্ত কষ্টে, বিবস্ত্র অবস্থায়। 

এখানে দৃশ্যটি কল্পনা করলে বাঙালি সহজাত যে পারিবারিক বন্ধন তার চিত্র ধরা পড়ে না। মানুষ যে কত নিষ্ঠুর, নির্দয় হতে পারে এই করোনা আমাদের নানাভাবে দেখিয়ে দিলো। ঘটনা পড়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া কি আর করার আছে? 

ভারতের দক্ষিণের কেরালাতে একটি অন্তঃসত্ত্বা হাতিকে বিস্ফোরক ভর্তি আনারস খাওনো হয় বা হাতিটি যে কোনভাবে খেয়ে ফেলে এতে হাতিটি মারাত্নকভাবে আহত হয়। সে একটা জলভুমিতে আশ্রয় নেয়, সেখানে সে তিনদিন দাঁড়িয়ে ছিলো। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ওখান থেকে তুলে আনা যায়নি হাতিটি ওখানেই মারা যায়। পরে জানা যায় হাতিটির বয়স ছিলো পনের ষোল বৎসর, সে অন্তঃসত্ত্বা ছিলো।ঘটনাটি একজন ফরেষ্ট অফিসার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার দিলে তা ভাইরাল হয়। শুধু ভারতে নয় বাংলাদেশেও ফেসবুকে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। মানুষের মানবিক দিকের পরিচয় খুব উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ে। 

জর্জ ফ্লয়েড যতটুকু কাঁদিয়েছে, একটা হাতি আমাদের যতটুকু কাঁদিয়েছে আমাদের ছাব্বিশজন বাঙালি ও একজন সাহাবউদ্দীন কি ততটুকু হৃদয়কে সিক্ত করেছে? তুলনামূলক একটা চিত্র আমি ভাবছি কেন এরকম হয়? কেন আমরা নিজেদের ব্যাপারগুলিকে কম গুরুত্ব দিচ্ছি অথচ আন্তর্জাতিক ব্যাপারগুলিতে নিজেদের আবেগটা বেশী প্রকাশ করছি। 

ছাব্বিশ জন জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক, সাহাবউদ্দীনের মত বঞ্চনার জীবন যাদের তাদের জন্য আমাদের মন তেমন ভাবে কাঁদে না। আমাদের আবেগ এখানে ভোতা হয়ে যায়।

আমরা কি খুব বেশী আন্তর্জাতিক হয়ে যাচ্ছি? এমনিতেই আমরা হজুগে জাতি তাই যেদিকে হুজুগ উঠেছে সেদিকেই ঝুঁকেছি!! 

আমাদের মনোবিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীদের এব্যাপারে গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সাহাবউদ্দীনের ঘটনা ও বুড়ো বাবা মা নিয়ে এরকম আরো অনেক ঘটনা এই করোনাকালে ঘটেছে। যা জাতি হিসাবে, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বা একে অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা কি হ্রাস পাচ্ছে? মেকী ভালোবাসায় আমরা এগিয়ে থাকতে পছন্দ করছি না তো?  

এই করোনা আমাদের শিখিয়ে দিলো কি করে স্বার্থপর হতে হয়।