ঘৃণার চাষাবাদ কে বন্ধ করবে?

সময়ের সাফ কথা….

ঘৃণার চাষাবাদ কে বন্ধ করবে?

হাসান জামান টিপু ॥ সমগ্র মানবজাতি এক ও অভিন্ন সত্বা। কিন্তু আজ আমরা ভয়ংকর রকমের বিভক্ত হয়ে পড়েছি। রাজনৈতিক, ধর্মীয়, শাসন, শোষণ এবং বাদ প্রতিবাদেও আমরা বিভক্ত হয়ে গেছি। রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা থাকলে এক রকম প্রতিবাদ, রাজনীতি না থাকলে নির্লিপ্ততা।

এই বাংলাদেশেই ইয়াসমিন, রাজন, সাগর-রুনি, তণু হত্যাকান্ড নিয়ে যেরকম সার্বজনিন প্রতিবাদ হয়েছিলো, ত্বকী হত্যার পর যেমন আলোড়ন হয়েছিলো এখনকার সেই প্রতিবাদে এক প্রকারের শ্রেণী বৈষম্য চলে আসছে। সড়ক দূর্ঘটনার পরে যে প্রতিবাদ হয়েছিলো তা সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ডে মানুষ শিউরে উঠিয়েছিলো। মসজিদ, মাদ্রাসায়, স্কুলে, বাসা বাড়ীতে যখন আমাদেও মেয়েরা ধর্ষিত হয়, নির্যাতিত হয়, নূসরাতকে যখন পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হয় তখন এদেশের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে, প্রতিবাদ করে, আন্দোলন করে, পুলিশের মার খায়, গুলি খায়। এক শ্রেণীর মানুষ কখনোই রাস্তায় নামে না, তাদের মুখ থাকে কুলুপ আটা।

সৌদি আরব গৃহকর্মী নেয়ার জন্য বাংলাদেশ কে চাপ দিতে থাকে, সরকার নিরুপায়, গৃহকর্মী না দিলে পুরুষ কর্মী নিবে না। একরকম বাধ্য হয়ে সরকার রাজী হয় গৃহকর্মী পাঠাতে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি এসব মহিলা কর্মী পাঠায় তারা বড় অংকের কমিশন পায়। অথচ পুরো ব্যাপারটাতে যা ঘটেছে তা রীতিমতো ভয়ংকর, আর প্রচলিত ইসলাম বিরুদ্ধ। কারণ সৌদি ইসলামে কোন মহিলার একা ভ্রমন করার কোন এখতিয়ার নাই। তবুও তারা প্রতিবাদ করেনি, তাদের মুখ কুলুপ আটা।

সৌদিরা যখন আমাদের মহিলা কর্মীদের ধর্ষণ করে, নির্যাতন করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়, মহিলারা কান্নাকাটি করে তাদের উপর জঘন্য নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় তখনও তারা কিছু বলে না। তাদের মুখে কুলুপ আটা। এই যে মহিলা কর্মীর লাশ দেশে আসলো তারা কেউ কোন আওয়াজ তুলেনি। তারা আজ বোবা কালা। তাদের মুখে কুলুপ আটা। বস্তুত বাংলাদেশের কোন মানুষের জন্য তাদের কোন দরদ ও মনোকষ্ট কিছু নাই। এদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, সুনামী, বন্যায় কোন দুর্যোগইে তারা আমাদের কোনই উপকারে আসে না। তাদেরকে মানবতার কোন কাজে পাওয়া যায় না। তবুও তারা আমাদের সমাজকে চালায়, কারণ তারা যখন ভয়ংকর হয় তখন তারা বিধ্বংসী হয়। সব কিছু লন্ডভন্ড করে ফেলে তারা।

তারা নাকি বড় হেফাজতকারী! শান্তির ধর্ম ইসলামের হেফাযতকারী! তাদের দেখা যায় ইজরাইলের বিরুদ্ধে, ফিলিস্তিনে কিছু ঘটলে, রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের দরদ, কাশ্মীরীদের জন্য দরদ, ভারতীয় মুসলমানদের জন্য তাঁরা জিহাদে ঝাপিয়ে পড়তে চায়, আফগানিস্তানে তালেবান হতে চায়। সিরিয়ায় আই এস হতে চায়। বাংলাদেশকে তারা আফগান বানাতে চায়।

তারা রামুতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে, সর্বশেষ ভোলাতে যে কারণে এতো ভয়ংকর হলো তাঁর কারণ হলো ফেসবুকের হ্যাক করা একাউন্টে মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর উপর কুৎসা রটনা। অন্য ধর্মের মানুষরা যদি এরকম করতো তাদের আইনের আশ্রয় নেয়া যেত কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় মুসলমানরা ফেসবুক হ্যাক করে নিজের নবীর নামে কুৎসা রটনা করে অসৎ উদ্দেশ্যে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ নিরীহ মানুষ। তাদের কোন অপরাধে এই শাস্তি পেতে হয় তাঁরা জানে না। কিন্তু সেই সব লোকগুলি ঘটনা জেনেও সেই হ্যাককারীকে কিছু বলে না।

ফেসবুকে অনেককেই দেখি নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) কে অপমান করে ষ্ট্যাটাস লিখে। এখানে অনেকেই প্রতিবাদ করে, আমিও করেছি কয়েক জায়গায় কিন্তু সেই সব লোকগুলি এই স্ট্যাটাসের ব্যাপারে কিছু বলে না, কোন আন্দোলন করে না, প্রতিবাদ করে না। শুধু সনাতন ধর্মের নিরীহ লোকদের তারা অকারণে বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে দেয়, বাস্তুচ্যুত করে।

ফেসবুক সেলিব্রেটি সেফুদা, যেদিন পবিত্র কোরআনকে অপমান করেছিলো তখন কিন্তু ঢাকায় বাইতুল মোকাররম এলাকায় সেফুদার ফাঁসি চেয়ে কোন মিছিল হয় নি। কারণটা অজ্ঞাত।

আমরা জানি তায়েফে হুজুর পাককে (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করলেও উনি পাথর নিক্ষেপকারীদের প্রতি কোন ঘৃণা প্রকাশ করেননি, প্রতিশোধ নেননি, এমনকি বদদোয়া পর্যন্ত দেননি। আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর হাবিবের এই অবস্থা দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও আল্লাহর নবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) তাদের জন্য দোয়া করেছেন- হে আল্লাহ তাদের হেদায়েত কর, তাদের সুমতি দাও। অথচ সেই নবীর উম্মত দাবীদার লোকগুলি কি ভয়ংকর তান্ডব করে! কেমন করে তারা তা করে! তারা নিজেদের পরিচয় দেয় তৌহিদী জনতা বলে! এই হিংস্র প্রকৃতির মানুষগুলি কেমন করে তৌহিদের কান্ডারি সাজে!

একেকটা ঘটনা ঘটে। মানুষ হয়ে মানুষকে আঘাত করে। সেই মানুষগুলি অসহায় হয়ে নিজের জন্মের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকে। সরকারও যেন অসহায়! সেই লোকদের কাছে জিম্মি! কারণ তারা সংগঠিত হয় দ্রুত। তাঁরা যেকোন কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে যে কোন সময়! কেন নতজানু সরকার! দেশে সাংবিধানিক আইন থাকতে তথাকথিত তৌহিদি জনতার দিনের পর দিন তান্ডব কেমন করে সহ্য কওে সরকার?

তবুও আমরা অবাক হয়ে, অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দেখি বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, গলার কাছে কান্না জমে রয়, অসহায় আক্রোশে অক্ষমতায় কুঁকড়ে যাই, তাদের জন্য কোথাও কেউ নাই। মানুষ অপমানিত হয় মানুষের কাছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো ধর্ম বড় হয়ে যায় মানবতার কাছে। মানুষ কে উপেক্ষা করে কোন ধর্ম কি প্রতিষ্ঠা হয়েছে আল্লাহর জগতে?  শান্তির (ইসলামের) ধর্মের মূল শিক্ষা কি তাই? মানবতা ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি কি আচরণ করতে হবে তা ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও কেন মানুষ ঘৃণার চাষাবাদ করে? সাধক নজরুল বলেছিলেন ‘যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে সে অপরের ধর্মকে ঘৃনা করতে পারে না’। শান্তি (ইসলাম) ধর্ম বাংলার সাংবিধানিক ধর্ম। এ ব্যপারে কিছু বলার বা করার থাকলে রাষ্ট্র তা করবে। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম অথচ হেফাযতে ইসলাম, তৌহিদী জনতা আর তথাকথিত ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি কেন, কিভাবে সাংবিধানিক ধর্মের বিষয়ে দেশে তান্ডব সৃষ্টি করে! সাংবিধানিক ধর্ম রক্ষায় সরকার তথা ধর্ম মন্ত্রনালয়ের কাজটা কি দেশের সচেতন নাগরিকরা জানতে চায়?