ঘুণে ধরা রাজনৈতিক অঙ্গন!

সংলাপ ॥ কাঁচা বাঁশে ঘুণ ধরে না। এটাই প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। কাঁচা বাঁশের শুকনা ছালের নিচে যে রস থাকে, তাতে ঘুণপোকাদের বাঁশ খেতে অসুবিধা হয়। খটখটে না হলে তারা খেতে পারে না। তবে প্রকৃতিতে অঘটনও ঘটে। কাঁচা বাঁশেও ঘুণে ধরে। সে বড় অলক্ষুণে। ঘুণে ধরা বাঁশ দাঁড়িয়ে থেকে বাঁশঝাড় শেষ করে দেয়।

প্রকৃতির সেই অলক্ষুণে অঘটনটা রাজনীতিতে একটা সরকারের ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। কাঁচা বয়সের সরকারে ও বিরোধী দলে ঘুণে ধরছে ভুলের জন্য। কুর কুর শব্দ করে খাচ্ছে। যারা সে শব্দ শুনছে আর মানুষকে শোনাচ্ছে, তাদের  ভয়ভাবনা হচ্ছে।  যারা ঘুণের শব্দ শুনেও শুনতে চায় না, তারা বাঁশটার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঘুণ কথাটার তিনটা অর্থ। একটি হলো ওই ঘুণপোকা। এরা রসহীন শুকনো খটখটে বাঁশে ধরে, কাঠে ধরে, মরাগাছের গিটে ধরে, গুঁড়িতে ধরে। খেয়ে খেয়ে অক্ষরের মত ক্ষত তৈরি করে। তাকেই বলে ঘুণাক্ষর। ঘুণ কথাটার আরেক অর্থ ছলাকলায়, গোঁজামিলে, নিপুণ, ওস্তাদ। তৃতীয় অর্থটি – ঈপ্সিত, আভাস। ঘুণের এই তিন অর্থই দেশের কাঁচা বাঁশ সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ফুটে উঠেছে।

ঘুণে ধরার প্রথম অর্থ ফুটেছে : বাঁশে যেটা রসের জোর, সরকারের ক্ষেত্রে সেটা হলো সাধারণ মানুষ দরদী -নীতির জোর। কাঁচা বাঁশ যখন মাটি থেকে রস নেবার শক্তি হারায়, ভেতরে দুর্বল হয়ে, খটখটে হয়ে পড়ে, তাকে ঘুণে ধরে। কাঁচা বাঁশের শুকনো হবার লক্ষণ ফুটে ওঠে।

ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বাঁশের মতো সরকারও যখন সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্যাণকর নীতি ও তার রূপায়নের শক্তির জোর হারাতে থাকে বিরোধীদলীয় ষড়যন্ত্রের জন্য তখন ভেতরে সঙ্কট তৈরি হয়। সরকার খটখটে হয়ে পড়ে। তাকে ঘুণে ধরে। তাদের কাজে-কথায় ফুটে ওঠে ব্যর্থতা, অনিয়ম, বেনিয়ম, মুখে বড়াই। হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি হয়। অপরদিকে বিরোধী রাজনীতিকরা ঢিলেঢালা, অগ্রাধিকার, জ্ঞানহীন, অস্থির, দিশাহারা হয়ে পড়ে। হলো না, মুখে আস্ফালন, মিথ্যা আশ্বাস, ধর্ম গেল দেশ গেল বলে মিথ্যাচার করে। কাজে ও কথায় ফারাক দেখা দেয়। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সঙ্কট সমাধানে তারা পথ খোঁজে না।

ছড়ায় আছে – পানের ভিতর ফোপরা। কাঁচা বাঁশ সরকারের ভিতর ফোপরা। স্বাস্থ্যক্ষেত্র, শিক্ষাক্ষেত্র, কৃষিক্ষেত্র, আইনশৃঙ্খলাক্ষেত্র, বিদ্যুৎক্ষেত্র, অর্থক্ষেত্র – এমন একটি ক্ষেত্র নেই যেখানে সঠিক ব্যবস্থাপনার নীতি গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য ঘুণে ধরেনি এবং তা হতে উত্তরণের জন্য নানা যুক্তি, দাবি, তর্ক তুলছে সরকার।

অপরদিকে বিরোধী শক্তির মিথ্যাচারে জেলায় জেলায় সাধারণ মানুষ রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। ক্ষেতমজুরের মজুরি কমছে। বন্টনবিলি ঠিক চলছে না। লুটতরাজের সন্ত্রাস সৃষ্টিতে দুর্বৃত্তরা প্রশ্রয় পাচ্ছে। প্রভাব খাটিয়ে  বিরোধী শক্তি অভিযুক্তকে আড়াল করছে, থানা থেকে ছাড়িয়ে – ছিনিয়ে নিচ্ছে। গণতন্ত্রের মাথায় কদর্য পা রেখে শিক্ষাঙ্গনে দলতন্ত্র বাড়াচ্ছে। জোট ও গোষ্ঠীর সংঘর্ষে এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে মারছে। শরিক দলের নেতাকর্মী আক্রান্ত হচ্ছে। এলাকায় মানুষ ভয়ে, অশান্তিতে সন্ত্রস্ত হয়ে  থাকছে। প্রতিহিংসা, আক্রমণ চলছে। খুন করা হচ্ছে। স্কুল -কলেজে ছাত্র পেটাচ্ছে। প্রতিবাদের মিটিং মিছিলে সন্ত্রাস করছে। মুখে গণতন্ত্রের কাঠামো রক্ষার কথা, গণতন্ত্রপ্রিয়তার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু কাজে বিপরীতটা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে আমলাতন্ত্রকে কাছে টানার পথ করছে। বিজ্ঞপ্তি দিয়ে,বিজ্ঞপ্তি বদল করে বিভ্রান্তি, ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়াচ্ছে বিরোধী শক্তি, অধিকারের মাত্রাবোধ হারাচ্ছে। জনগণতন্ত্রের নীতিরীতি অনুসরণ না করে জনগণের কাছে নিজেদেরকে হাস্যস্পদ করে তুলছেন। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা অগ্রাহ্য হচ্ছে। প্রতিশ্রুতির যত ফানুস একে একে ফাটছে।

প্রবাদ আছে, সকাল দেখে দিন কেমন যাবে বোঝা যায়। সরকারের ঢিলেঢালা নীতি তাকে ঘুণে ধরিয়েছে। ঘুণে ধরা কাঁচাবাঁশ সরকারটা সময়ের তালে তালে কঠোর ব্যবস্থা প্রতি অঙ্গনে না নিলে কখন দেশবাসীর মাথায় ভেঙে পড়ে এই আশঙ্কায় জাতি দোদুল্যমান!

ঘুণে ধরার দ্বিতীয় অর্থ ফুটেছে : ঘুণ ধরার কথা আড়াল করতে, দেশবাসীর সব মৌলিক ও জরুরি জীবন-যন্ত্রণার সমস্যা সমাধানে সরকারের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নতুন সরকার গড়তে যে জনমর্থন ছিল তা ধরে রাখতে সরকার নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে। ইতোমধ্যে আমলাদের দপ্তর বার বার বদলি করা হয়েছে। অপেক্ষায় আছেন অনেক মন্ত্রী। সরকারের নীতি জনস্বার্থমুখী হলেও ঘুণে ধরায় দোষ অপদার্থ কিছু মন্ত্রীর।

বিরোধী রাজনীতিকদের আরেক দক্ষ কৌশল হলো – বাঙালির অন্তরে যে দিকে টান বেশি, ভাবাবেগ বেশি, যে আবেগ যে বিষয়ে তাদের মধ্যে খেলে বেশি, সে সব ভাঙিয়ে খাও। সে সব নিয়ে নতুন নতুন ঘোষণা, হইচই, কাজের জিগির ও কর্মব্যবস্ততা তোলায় সুযোগ খুঁজতে থাকো। বরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্বকে, বিদ্রোহী  কর্মাত্মাকে, বিপ্লবী ঐতিহ্যকে ভাঙিয়ে খাও। ঘুণে খাওয়ার কুর কুর শব্দ চাপা দিয়ে বিরোধীদল যে সবুজ  আছে, তার প্রমাণ করো। পাশাপাশি কৌশল নিয়েছে সরকারের ব্যর্থতা, বিরোধিতা ও বিদ্বেষ বাড়ানোর।  উদ্দেশ্য একটাই, পিছিয়ে থাকা মানুষদের মনকে সরকার সম্পর্কে বিষাক্ত করা। এরপর হয়তো বলা হবে সরকার চক্রান্ত করেছে। ছলাকলা চমক ভঙ্গি। ঘুণধরা থেকে মানুষের চোখ সরাতে যতই বাঁশের গিটে গিটে চমক ও প্রতিশ্রুতির নতুন পাতা ও কঞ্চি পোঁতা হোক আর তাকে সজিব প্রমাণের চেষ্টা করা হোক, ঘুণ বিরোধীদের ছাড়ছে না। হ-য-ব-র-ল-ব খট খটে বিরোধীদের বড় সুখ। কুরকুর শব্দে তারা বাঁশ খায়, কাঠ খায়, মরাগাছের গিট খায়, সরকারও খায়। ইতিহাসে শোনা যায়, একদল পন্ডিত মানুষের মাথাতেও ঘুণ ধরে। মস্তিষ্ক কুরে কুরে খায়। সেখানে ঘুণাক্ষর তৈরি করে। তখন প্রভু তাদের যা নির্দেশ দেয়, তারা সে মতো চলে, বলে, কাজ করে সেটাও চলছে বর্তমানে।

ঘুণে ধরার তৃতীয় অর্থ ফুটেছে ঃ ঘুণে খাওয়ার কুরকুর শব্দের মধ্যে, আর ঘুণাক্ষর পড়ে সরকার  আশঙ্কার ইঙ্গিত, আভাস, আঁচ করছে। সরকারের যত হিতাকাঙ্খীরা যারা কাঁচা বাঁশ – সরকারটিকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এনেছে, তারা কাঁচা বাঁশে এখন ঘুণের কথা দেখিয়ে সরকারকে সতর্ক করছে। পরামর্শ দিচ্ছে, সরকার কাঁচা নবীন সবুজ থাকে যদি তার শেকড়ে শেকড়ে, প্রশাসনিক দক্ষতা, সমন্বয় ও সফলতায় রসের যোগান যাতে থাকে। তা না হলে মেঠো বক্তৃতা আর মনোরঞ্জনী প্রচারে চিঁড়ে ভেজে না। বিরোধী অবস্থানে যা চলে, সরকারের অবস্থান থেকে তা চলে না। গোঁজামিলে প্রশাসন দুর্বল হয়। মরা বাঁশে চমক ও প্রতিশ্রুতির ডালপালা সাজিয়ে মরাকে জীবিত বলে ভ্রম সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু ঘুণপোকাকে ফাঁকি দেয়া যায় না।

জোট-শরিক সম্পর্ক তাদের অসন্তোষের বিষয়ে সজাগ করছে। প্রতিরোধের চেহারা, জনমত সৃষ্টির সাফল্য, শুনিয়ে সতর্ক করছে। ঘুণপোকা মারার কৃৎকৌশল সম্পর্কে ইঙ্গিত, আভাসও দিচ্ছে। সরকারের কাছে তাদের বিপুল প্রত্যাশায়,প্রতিশ্রুতি পূরণের কার্যকর ভবিষ্যৎ দিশা পাচ্ছে না – এসব কথা সরকার হিতাকাঙ্খীরা নানাভাবে শোনাচ্ছে। সরকার ঠিক ঠিক নজর দিচ্ছে না বলে ক্ষোভও প্রকাশ করছে। কমিটি গঠনে আধিক্য, অনিয়ম-বেনিয়ম সম্পর্কে সতর্ক করছে।

অপরদিকে মিথ্যাচার আর ষড়যন্ত্র করে বিরোধীদলীয় শক্তিতে ঘুণ তার সব অর্থেই কাঁচা বাঁশ রাজনীতিতে আগাগোড়ায় ধরেছে। ঘুণাক্ষরে ফুটে উঠছে – বিরোধী শক্তির ভিতর ফোপরা।

ঘুণে ধরা বাঁশের রাজনৈতিক ইতিহাস হলো – ভেতরে ফোপরা নিয়েও সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে অনেকদিন। কিন্তু সময় বুঝে, দেশবাসীর হাত জড়ো করে, সরকারের জোর সাহসী ধাক্কা বিরোধী শক্তির মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে দেয়া হলে, ঘুণে ধরা বাঁশ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে বাধ্য। বিপদ কাটে। সাধারণ মানুষ বাঁচে। স্বস্তি শান্তি ফিরে আসে দেশে।