গুজব সৃষ্টিকারীদের সাথে কোনো আপোষ নয়

সংলাপ ॥ ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে সমবেত লাখো জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী পেছনে ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি, নন্-বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ -বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ চিরকাল বাংলাদেশের মানুষ ও বাঙালি জাতিকে প্রেরণা যোগাবে, পথনির্দেশনা দেবে। ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রতিক হাঙ্গামা, পেঁয়াজ ও লবণ সঙ্কটের গুজব ছড়িয়ে জনমনে অস্বস্তি তৈরি, সড়ক পরিবহন আইনে মৃত্যুদ-ের গুজব রটিয়ে ধর্মঘট ডেকে দুর্ভোগ সৃষ্টি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কথাগুলোই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্নভাবে এই সব গুজব সৃষ্টি করে দেশ ও দেশের জনগণকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দেয়া একটি বিশেষ মহলের সুগভীর ষড়যন্ত্র  কি-না তা সচেতন ও বিবেকবান মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। শত্রুবাহিনী এখন আর বাইরের কেউ নয়, ভেতরেই এদের অবস্থান।

এই গুজব ও অশান্তি সৃষ্টির ঘটনা তখনই ঘটছে যখন দেশে দুর্নীতিবিরোধী এবং রাজনীতিতে অপশক্তি ও অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের অভিযানের ঘোষণায় শান্তিপ্রিয় জনগণ আশ্বস্ত হয়ে উঠছিল। ইতোমধ্যে রাজনীতির অঙ্গনে বেশ কিছু গৃহীত ইতিবাচক পদক্ষেপ দেশবাসীর নজর কেড়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গসংগঠন, যেমন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে আসীন কিন্তু দুর্নীতিতে জড়িত বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে দল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাপক প্রস্তুতি ও আয়োজন করে সংগঠনগুলোর নতুন সম্মেলন ও কংগ্রেস অনুষ্ঠান করে এগুলোতে নতুন এমন নেতৃত্ব আনা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই বললেই চলে। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত সাহসিকতা এবং দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরকিতার বহিপ্রকাশ হিসেবেই তিনি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার এই কাজে হাত দিয়েছেন।  এই কাজটি কত যে কঠিন তা শুধুমাত্র সচেতন মানুষদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

দেশ ও জনগণের শান্তি ও মঙ্গলের জন্য দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযানে সফল হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের স্তরে স্তরে যোগ্য ও জনবান্ধব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিভিন্নভাবে গুজব সৃষ্টিকারীরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যে অপকৌশল প্রয়োগ করে চলেছে সে ব্যাপারে সরকারকেও সক্ষমতার প্রমাণ অবশ্যই দিতে হবে। আজকের দিনে একটি নিরেট ও নির্ভেজাল সত্য হচ্ছে – গ্রাম থেকে শহর-নগর-বন্দর-সর্বত্রই আজ উন্নয়নের স্পর্শ লেগেছে। মানুষে-মানুষে আত্মিক হৃদ্যতা না বাড়লেও, মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলেও অর্থনৈতিক উন্নতির জোয়ারে প্রতিটি জনপদই এখন মুখরিত। মানুষের কাছে এখন টাকা-পয়সার অভাব নেই বললেই চলে। পরিবারে-সমাজে-রাজনীতিতে-শিক্ষাঙ্গনে-অফিস আদালতে অনেক ক্ষেত্রে যে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়, তা ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’-এ প্রচলিত কথাটিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিককালে বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগরসহ বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত ঘটনাবলীর একটিও শিক্ষা-শিক্ষার্থী-শিক্ষক এসব কারও মৌলিক স্বার্থ আদায়ের আন্দোলনজনিত কারণে ঘটেনি। এ সবগুলোই ছিল অর্থবিত্তের বাহাদুরি, আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্কটজনিত পরিণতি। বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যায় ২৬ জন ছাত্রের স্থায়ী বহিষ্কার রাজনীতি এবং ছাত্র-রাজনীতিতে পেশীশক্তি-দুর্নীতি কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে তা আবারও সবাইকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গন ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে গুজব সৃষ্টি হয় তার পেছনে আমলাতন্ত্রে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজ চক্রের যোগসাজশ কতটা তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে কি-না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ফলে সরকার পরিচালনায় আমলাতন্ত্র এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। উপজেলা-জেলাসহ সর্বত্র স্থানীয় সরকার পরিচালনায় সরকার পুলিশ প্রশাসনসহ জনপ্রশাসনের আমলাদের উপরই এখন বেশি নির্ভরশীল। অনেক আমলা স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে দেশের উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন-এ কথা যেমন ঠিক, আবারও দুঃখজনকভাবে সেটাও ঠিক যে- সচিবালয়সহ জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে কর্মরতদের বিরাট অংশই জামায়াত-বিএনপি আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। বর্তমান সরকারের আমলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জামায়াত-বিএনপি আমলের নিয়োগপ্রাপ্তরাই পদোন্নতিসহ সরকার থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। এরজন্য তারা যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধে আবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে মনোনিবেশ করবেন-এমনটি চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। বরং, এরাই আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অশুভ চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে সরকার ও জনগণকে বেকায়দায় ফেলার নানামুখী ষড়যন্ত্র করছে কি-না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে সচেতন মহলের অভিমত। প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশ, সহযোগিতা ও ইন্ধন ছাড়া শুধুমাত্র বেসরকারি কোনও ব্যক্তির পক্ষে অপরাধ সংঘটন অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাই দেশে গুজবসৃষ্টিকারী দুর্নীতিবাজ চক্র এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়দাতা আমলা, রাজনীতিক এবং সর্বোপরি সরকারের বিভিন্ন সংগঠনে অনুপ্রবেশকারীদেরকে সনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। এদের সাথে কোনো রকমের আপোষ, বোঝাপড়া এবং এদের কাছে নতি স্বীকার দেশ, জাতি ও সরকারের জন্য শুধু অমঙ্গলই ডেকে আনবে।