কর্মফলে লব্ধ শিক্ষা জাতির জন্য কল্যাণকর

শেখ উল্লাস ॥ বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজারবাইজানে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) ১৮তম সম্মেলনে যোগদান শেষে দেশে ফেরার আগে গত ১০ কার্তিক ১৪২৬,২৬ অক্টোবর ২০১৯ শনিবার ওই দেশের রাজধানী বাকুতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘অন্যকে শিক্ষা দেওয়াটা নিজের ঘর থেকেই শুরু করা উচিত। আমি সেটাই করছি এবং এটি অব্যাহত রাখব’। অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে পুনরায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, সে যে-ই হোক এবং যে দলই করুক না কেন। আপনারা দেখেছেন, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদি আমাদের দলের কেউ অপরাধে জড়িত হয়, সে তৎক্ষণাৎ শাস্তি ভোগ করছে।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘অপরাধীরা অপরাধীই, আমরা অপরাধী দৃষ্টিতেই দেখব এবং আমরা সেটাই দেখার চেষ্টা করছি।’ বিএনপি-জামায়াত সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের পাঁচ বছরের দুঃশাসনে দেশে দুর্নীতির কোনো সীমা ছিল না।’ শেখ হাসিনা বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের হীন স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।

‘শিক্ষা দেওয়াটা নিজের ঘর থেকেই শুরু করা উচিত’-মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটি দেশের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা দেওয়া বলতে তিনি যা বুঝিয়েছেন দেশের চলমান বাস্তবতায় তা অনুধাবন করতে পারা কারো পক্ষেই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশে বর্তমানে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে এবং সে অভিযানের প্রাথমিক টার্গেটই হচ্ছে তাঁর নিজ দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ভেতরে দুর্নীতিবাজদের যে অশুভ চক্র গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অথচ তাঁর দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এদেশের স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, এ দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক-পৃষ্ঠপোষক ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নিজেদের প্রাণ বিসর্জনও  দিয়েছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে, দেশে সুশাসন ও ন্যায় বিচার  প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রামে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এই দলের নিঃস্বার্থ নেতাকর্মীরাই, যাঁদের অনেকেই আজ দলের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এর বিপরীতে আজ দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় তখন দলে অনুপ্রবেশকারী ‘হাইব্রীড’রাই সুবিধা নিচ্ছে, দলের নাম ভাঙ্গিয়ে, বঙ্গবন্ধুর সাইডবোর্ড লাগিয়ে দোকান খুলে নগদ-অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছে। এরা কেউই কিন্তু অশিক্ষিত নয়, সবাই শিক্ষিত!

এদিকে, সম্প্রতি গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তারা ৫০ লাখ গ্রাজুয়েটকে সনদপত্র দিয়েছেন। এই বিশাল অংক থেকে দেশে উচ্চ শিক্ষিত লোকের বিশাল সংখ্যাটি সম্পর্কে আঁচ করা যায়। এছাড়া দেশে বর্তমানে শতাধিক  সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেগুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে। আর ধর্মীয় বিষয় নিয়ে শিক্ষার সাথে জড়িত বিভিন্ন ধরনের মক্তব-মাদ্রাসার সংখ্যা তো এখন সবচেয়ে বেশি। মসজিদ নেই এমন কোনো পাড়া-মহল্লা-গ্রাম বাংলাদেশে এখন একটিও পাওয়া যাবে না। মানুষ-সমাজ-সরকার ও রাষ্ট্র সকলই এখন অর্থবিত্তের মালিক, আর সেই অর্থবিত্ত দিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির জন্য মসজিদই বেশি সংখ্যক হারে নির্মাণ চলছে সারা দেশে। প্রতি বছর হজ্ব করতে যান লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যে যে জিনিষটির অভাব বেশি বোধ করছে জাতি সেটা হচ্ছে মানুষকে নৈতিকভাবে, ধর্মের প্রকৃত অনুশাসন মেনে চলার মতো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোথায় যেন ফারাক তৈরি হয়েছে।

তাই তো এ কথা আজ স্বীকার করতেই হয় যে, প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হচ্ছে না। কোথায় যেন একটি সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। আর এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট আকার ধারণ করে যখন একটি দল ক্ষমতায় আসীন হয় তখন থেকে। এ অবস্থাটা ক্ষমতাসীন সকল রাজনৈতিক দলের বেলাতেই দেখা গেছে। স্বাধীনতার এই অবস্থাটি নিশ্চয়ই কারও কাম্য ছিল না। এ অবস্থাটি উপলব্ধি করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রহমান তাঁর জীবদ্দশায় বহুবার বহুভাবে আক্ষেপ করেছেন। তিনি বলতেন, দুর্নীতি বাংলার কৃষকরা করে না, দুর্নীতি করে শিক্ষিত সমাজ। কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সর্বজনশ্রদ্ধেয় সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ‘যদি রাজনীতি করো তাহলে দুর্নীতি করো না, আর যদি দুর্নীতি করো তাহলে রাজনীতি ত্যাগ করো।’  তাঁর মতে, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম।’  বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’  প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সেই সোনার মানুষ কতজন সৃষ্টি হচ্ছে, কেন হচ্ছে না, কীভাবে সৃষ্টি করা যাবে-এসব বিষয়ে কর্মপন্থা গ্রহণই আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা শিক্ষিত হয়েও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়, মিথ্যাচার করে, বিদেশে টাকা পাচারসহ বিভিন্ন রকমের অনিয়ম ও অনাচারের সঙ্গে জড়িত হয় তাদেরকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে। এই শিক্ষা অনানুষ্ঠানিক এবং প্রাকৃতিক। মহান সাধকের বাণী এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য, ‘প্রত্যেক ব্যক্তিই তার স্বীয় কর্মবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে।’ কর্মফল ভোগের মধ্য দিয়ে লব্ধ শিক্ষার স্থায়িত্ব ও ফল ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও জাতি সবার জন্যই কল্যাণকর হতে পারে।