করোনা বার্তা করোনা শিক্ষা

সাগর সগীর বিংশ শতাব্দী শুরুর প্রথম এক দুই দশকে বিজ্ঞান প্রযুক্তিসহ সমাজ ও অর্থনীতিতে সম্ভাবনার যে পদধ্বনি ভেসে আসছিল তার প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া এই শতাব্দীকে ‘সম্ভাবনার যুগ’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। বিস্ময়কর সেই সম্ভাবনার ‘যান্ত্রিক তরী’ বেয়ে বিংশ শতাব্দী বিদায় নিয়েছিল মানব জাতির জন্য  অবাক-করা সব উপহার দিয়ে।

আর ২১ শতক, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিসহ ব্যাক্তি, পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্র, একই সাথে অর্থনীতি রাজনীতি, সমাজনীতি প্রায় সবকিছুকেই এনে দাঁড় করিয়ে দিতে শুরু করে যুগান্তকারী পরিবর্তনের মুখে অপ্রত্যাশিত ভাবে, যার ফলে একবিংশ শতাব্দী হয়ে উঠতে শুরু করে ‘অতি সম্ভাবনার যুগ’ হিসাবে।

আর আজ চলমান এই শতকের দুই দশক সমাপ্তির মুখে এসে গোটা বিশ্ব আকস্মিক মুখোমুখি হলো অভাবনীয় অচিন্তনীয় অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতির, এক বাস্তবতার। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এর নায়ক অথবা খলনায়ক, যাই বলা হোক না কেন সেটি হলো করোনা ভাইরাস- কোভিট ১৯। মানব সভতার ইতিহাসে এই প্রথম তথাকথিত অনুন্নত বিশ্ব থেকে উন্নয়নশীল এবং এমনকি উন্নত বিশ্ব পর্যন্ত করোনার কাছে করতে হয়েছে অসহায় আত্মসমর্পন, যার নাম ‘লকডাউন’। গোটা পৃথিবীতে মুখে মুখে বক্তৃতা, বিবৃতি, আলোচনায়, পর্যালোচনায়, সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়  এবং ইলেক্টনিক কিংবা সোস্যাল মিডিয়ায় দুটি শব্দ ঘুরে ফিরে উঠে আসছে অবিরাম, নজীরবিহীন ভাবে, যার নাম করোনা ভাইরাস এবং লকডাউন।

 ‘করোনা’ আর ‘লকডাউন’ প্রবল সুনামী  ভয়ংঙ্কর ঘূর্ণিঝড় কিংবা  বিধ্বংসী ভূমিকম্পের মতই ধ্বংস, চুরমার করে দিচ্ছে, দিয়ে চলছে মানুষের স্বপ্নের সাজানো বাগান। এলোমেলো উলট-পালট করে দিচ্ছে ব্যক্তি ও পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের সকল হিসাব-নিকেশ, উদ্যোগ, প্রকল্প, পরিকল্পনা- বলা যায় সবকিছুই। ইতিমধ্যেই করোনা ভাইরাস তার ঝুড়িতে ভরে নিয়েছে তার অপ্রতিহত ক্ষমতার স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় তকমাটি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষনায় যার নাম দেয়া হয়েছে ‘মহামারী’র বদলে ‘অতিমারী’! 

করোনা নিয়ে গোটা বিশ্বব্যাপী চলছে বহুমাত্রিক ব্যাখা-বিশ্লেষন যা চলমান, কতদিন চলমান থাকবে বলা মুশকিল। তবে করোনা যে মানব জাতির জন্য ‘করোনা বার্তা’ এবং ‘করোনা শিক্ষা’ নিয়ে আসছে তা একটু গভীরে গিয়ে দেখলেই সহজে বুঝা যায়। সংক্ষেপে প্রাথমিক তাৎক্ষনিক পর্যবেক্ষনে এই করোনা বার্তা ও করোনা শিক্ষা হচ্ছে-

করোনা বার্তা:

করোনা ভাইরাস প্রথমতঃ  আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের মতন বিশ্বের তাবদ শক্তিধরদের সামনে এই স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছে যে –

‘তোমরা দেখিয়ে এসেছো, বলে চলেছো  কি  পারমানবিক, কি  আনবিক বোমায়, কি অপ্রতিহত সামরিক বাহিনী অথবা অবাক করা তথ্য প্রযুক্তিতে, কত্তো শক্তিধর তোমরা!

এবার দেখো কতো শক্তহীন তোমরা আমার মত এক অদৃশ্য জীবাণুর কাছে !

করোনার দ্বিতীয় বার্তাটি বলা যায় ‘কঠিন বার্তাটি’ হলো, বাঙ্গালী কবির ভাষায় –

‘সকলের তরে সকলে আমরা,

প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। 

অর্থাৎ, (প্রতীকী অর্থে হলেও !) মাস্ক কেন পরতে হবে ? ‘তোমার সুস্থ থাকার জন্য কেবল নয় (!) , আমার সুস্থ থাকার জন্যও, আমাদের সকলের সুস্থ থাকার জন্যও।

আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থকেন্দ্রিক এমন কি পরিবার গোষ্ঠী থেকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জীবন ভাবনার মূলে আঘাত হেনে চলেছে করোনা ! বুঝিয়ে দিয়েছে দিচ্ছে  ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ অর্থাৎ যেন সত্যিকারের ‘বিশ্ব-গ্রামের’ বাসিন্দাদের মতই রাষ্ট্রগুলোকে পথ চলতে হবে একে অপরের হাত ধরে – নিজেদেরই প্রয়োজনে নিজেদেরই স্বার্থে।

করোনার তৃতীয় বার্তাটি হচ্ছে

জুতা আবিষ্কারের রূপক গল্পটির  শিক্ষা । পা কে ধূলোমুক্ত রাখার উপায় যেমন পথ ঘাট ধরিত্রী চামড়ায় ঢেকে দেয়া না, বা জল ছিটিয়ে ধূলোকে কাদায় পরিণত করাও না, ঠিক তেমনি, করোনা ভাইরাসদের হাত থেকে রেহাই পাবার পথ লকডাউন না। যদিও এই মূহূর্তে তা  আপাতত, কার্যত অবিকল্প। কিন্তু তা কোনক্রমেই স্থায়ী অথবা মাসের পর মাস কিংবা বছরব্যাপী চলতে পারে না। আবার কোন ভ্যাকসিনও স্থায়ী সমাধান না। কয়টার জন্য ভ্যাকসিন বের করবে ! সার্স, ইবোলা ইত্যাদি যে একের পর এক আসছেই এবং আসতেই থাকবে ! 

করোনার প্রতিরোধে এক্ষেত্রে শিক্ষাটি হলো, মানুষের শরীরে সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিনষ্ট হতে না দেয়া, তা পুনরুদ্ধার করা, সংহত রাখা । কেবল তাহলেই করোনাই হোক বা হোক তার চেয়ে শক্তিশালী ভাইরাস, মানুষের সহজাত অটুট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সেসবকে দেহে নিষ্ক্রিয় করে রাখার ক্ষমতা রাখে সারা জীবন।

করোনার চতুর্থ বার্তাটি হলো

মানুষের মধ্যে চলে আসা, বিদ্যমান বহির্মুখী, বহির্জগতমুখী প্রবনতাকে অন্তরমুখী, ভেতরমুখী  হওয়ার,আত্মমুখী হয়ে উঠার তাগিদ। চব্বিশ ঘন্টার জীবনে আমরা চব্বিশ মিনিটও একান্ত নিজেকে নিয়ে কাটাই না, একান্তে নিজের মুখোমুখি হওয়া, নিজের সাথে নিজেকে নিয়ে সংলাপ করি না ! করোনায় ঘরবন্দী দশা বাধ্যতামূলক ভাবে সে সুযোগ করে দিয়ে মানুষকে ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ আত্মমগ্ন’ হতে বলছে যেন ! যেন করোনাকে দিয়ে মহাকালেশ্বর মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দিলেন।

করোনা শিক্ষাএক:

করোনার প্রথম শিক্ষাটা হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার  এবং রাষ্ট্রের সামনে বর্তমানের মতই, বর্তমান দিনগুলির মতই  আগামী দিনে, আগামী বছরগুলোতে প্রধান ভাবনা, মূল মাথা ব্যথা, ‘নাম্বার ওয়ান এজেন্ডা’ হয়ে উঠছে, হয়ে উঠবে ‘স্বাস্থ্য’ ।

করোনা শিক্ষাদুই: 

আর এই স্বাস্থ্যের প্রশ্নে মূল মনোযোগ হবে রোগ প্রতিকারে নয় রোগ প্রতিরোধে  –  ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘Preventive health’। অবশ্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে আসছিলো। চিকিৎসা নীতিতে ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘Prevention is better than cure’। অর্থ্যাৎ রোগ প্রতিকারের থেকে রোগ প্রতিরোধটিই শ্রেয়। অথচ এতকাল ধরে কি পারিবারিক, কি রাষ্ট্রিয় চিকিৎসা উদ্যোগে প্রাধান্য পেয়ে আসছিলো রোগ প্রতিকারের বিষয়টি!

আজ ঘটনার আকস্মিকতায় বিশ্বের প্রায় ছোট বড় প্রতিটি রাষ্ট্রই করোনা ভাইরাস আক্রমন -সংক্রমন ঠেকাতে বেছে নিতে বাধ্য হয় ‘লকডাউন’ নামক প্রতিরোধী হাতিয়ারটিকে। যার বিকল্পও ছিলোনা বস্তুতঃ। কিন্তু বাস্তবে করোনা ভাইরাসের চেয়েও বড় ক্ষতির কারন হিসেবে দেখা দিয়েছে লকডাউন নিজেই। বলা যায় অপূরনীয় ‘আর্থিক বিপর্যয় ‘আর আকস্মিক ভয়াবহ দারিদ্র বিপর্যয়ে বেসামাল দশা সর্বত্রই সর্বক্ষেত্রেই। প্রায় দিশেহারা আজ পরিবার বা প্রতিষ্ঠান প্রধান আর রাষ্ট্র বা বিশ্ব কর্নধারগন। বিষয়টি এরকম ‘কুইনাইনে জ্বর সারবে, কুইনাইন সারাবে কে’! অথবা এ যেন মাথা বাঁচাতে গিয়ে খোদ মাথাটিই কাটা পরার উপক্রম। করোনা প্রতিরোধে ভ্যাক্সিনেও  ভরসা রাখা যাচ্ছেনা যদিও কবে এর ভ্যাক্সিন আসবে, কত মাসে, এমন কি কয় বছরে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ পর্যায়েই ‘নানা মুনির নানা মত’। এছাড়া ভ্যাক্সিন কয় ভাইরাসকে ঠেকাবে!  ইবোলা,সার্স ….থেকে কোভিট ১৯ একের পর এক যে আসতেই থাকে, থাকছে ঘূর্ণীঝড়, টর্নেডো, ভূমিকম্পের মতই!

করোনা শিক্ষা

স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রশ্ন উঠে আসে লকডাউন- ভ্যাক্সিন এর বাইরে কোন সে হাতিয়ার আছে যা করোনাদের ঠেকাতে হয়ে উঠবে অব্যর্থ ?

প্রথমেই এরূপ যে হাতিয়ারটির নাম উঠে আসে তা হচ্ছে ‘way of life’ বা জীবন যাত্রা জীবন ধারা বদল। করোনা মোকাবেলায় মানুষকে, পুনর্বিন্যাস করতে হবে, পাল্টাতে হবে তার জীবন যাত্রা- জীবন ধারা। বিশ্বের আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় গবেষক- পন্ডিতগণ একযোগে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ,উচ্চ রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস, স্ট্রোক, ক্যান্সার, কিডনীর সমস্যা এমনকি এইডস এর মত জীবন ঝুঁকিপূর্ণ রোগগুলির জন্য দায়ী করেছেন  এই way of life বা জীবন যাত্রা জীবন ধারাকে।

রোগ প্রতিরোধে দ্বিতীয় শক্তিশালী হাতিয়ারটির নাম ভেষজ চিকিৎসা তথা হারবাল মেডিসিন। 

তৃতীয় হাতিয়ারটি হচ্ছে জৈব বিদ্যুৎ ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি যার মধ্যে রয়েছে আকুপাংচার, আকুপ্রেশার, রিফ্লেক্সোলজি।

চতুর্থ হাতিয়ারটি হচ্ছে যোগ,যাকে বিশ্বব্যাপি পরিচিত শব্দে বলা হয় Yoga। 

পঞ্চম হাতিয়ারটি হচ্ছে, সাধারনভাবে যাকে বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক চিকিৎসা-ন্যাচারপ্যাথি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জল চিকিৎসা (water therapy),  রং চিকিৎসা (colour therapy), মাটি চিকিৎসা (Mud therapy), রৌদ্র স্নান চিকিৎসা (Sun bath treatment)।

ষষ্ঠ এবং শেষ হাতিয়ার টি হচ্ছে ধ্যান (Meditation), কাউন্সিলিং (পরামর্শ), মোটিভেশন বা উদ্বুদ্ধকরন।