করোনা ঠেকানোর আগে চাই ভয় কে ঠেকানো-

সাগর সগীর

করোনা ভাইরাসের প্রতিকার নিয়ে মাথা ব্যথা হচ্ছে তাদের যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা করোনা রোগিদের সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব যাদের কাঁধে সেই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এবং আক্রান্তদের পরিবার পরিজন তথা স্বজনদেরও (অবুঝ শিশু,পাগল এবং যাদের এ-নিয়ে কোন খোঁজ খবর নেই, মাথা ব্যথাই নেই তারা ছারা)। করোনা ভাইরাস নিয়ে আজকের বাস্তবতায় মানুষের মাথাব্যথা হচ্ছে কি করলে করোনার সংক্রমন হবে না অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক কি এই ভাবনা।

করোনার ছোবল থেকে নিজেকে দূরে রাখার মোক্ষম উপায় নিয়ে কথা বলার শুরুতে একটি ছোট্ট গল্প বলে নেয়া যাক। পেটের অসুখে প্রায়শঃই ভোগা এক রোগীকে নিয়মিতই একজন ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। ডাক্তার যথারীতি ঔষধ দিতেন এতে রোগীর কিছুটা বা অনেকটা কখনওবা পুরোটা উপশম হলেও কিছুদিন পর আবারো ডাক্তারের কাছে যেতে হতো ঐ পেটের গন্ডগোল নিয়েই। এবার ডাক্তার রোগীকে তার রোগী দেখার টেবিলে শুইয়ে দিয়ে তার চোখে ‘আই ড্রপ’ দিতে উদ্দত হলেন। রোগী তখন চেঁচিয়ে বলে উঠল, ডাক্তার সাহেব আপনি মনে হয় ভুলে গেছেন আমিতো আপনার কাছে আসি পেটের সমস্যার জন্য চোখের নয়! ডাক্তার তখন বললেন, না সমস্যা আপনার পেটের নয় সমস্যা আপনার চোখে। আপনি যা-ই দেখেন তা-ই খেতে ইচ্ছে করে । আগে আপনার চোখ ঠিক করতে হবে!

‘আগে চোখ ঠিক করতে হবে’ -ঠিক তাই । করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে ‘আগে চোখ ঠিক করতে হবে’। না, এখানে চোখ বলতে চোখ-কে বুঝানো হচ্ছে না। এক্ষেত্রে চোখ বলতে ‘ভয়’কে বুঝানো হচ্ছে। আর ‘ঠিক করা’ মানে ‘দূর করা’ অর্থাৎ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়কে দূর করা এটাই হচ্ছে করোনা সংক্রমন থেকে নিজেকে নিশ্চিত বাঁচানোর সুনিশ্চিত উপায়, বলা যায় ‘অব্যর্থ হাতিয়ার’। এই প্রসঙ্গে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির ঝুলিতে জমা হওয়া পাঁচটি শব্দ উল্লেখ করতে হচ্ছে, যে শব্দগুলি করোনা জাতীয় বিপদজনক ভাইরাসগুলির চেয়েও বিপজ্জনকভাবে কাজ করে মানুষকে বিপদগ্রস্থ সঙ্কটগ্রস্থ করে তোলার জন্য । এই শব্দ পাঁচটি হচ্ছে – ‘যদি’, ‘হয়তো’, ‘কিনা’, ‘নাকি’ এবং ‘কিন্তু’। এই পাঁচটি শব্দ মানুষের চিন্তা ভাবনা বুদ্ধি বিবেচনাবোধের উপর কাজ করে অনেকটা মোবাইল-কম্পিউটারকে ‘হ্যাঙ্গ’ করে দেয়া ভাইরাসের মতই। কেউ বলতেই পারেন যে ‘যদি করোনায় আক্রান্ত হই’ বা ‘করোনা পেয়ে বসে কিনা’ – এই জাতীয় আশঙ্কাতো থাকবেই, ভয়তো হবেই! চারদিকেইতো সংক্রমন হচ্ছে দিনকে দিন, আর আমি আর মানুষ ভয় পাবে না! শঙ্কিত হবে না! বললেই হলো !

কথাটি ঠিক। করোনা সংক্রমনের ভয় আশঙ্কা জনমনে জেঁকে বসেছে বলেইতো এই প্রসঙ্গ আসছে । এই ভয় এই আশঙ্কা খাল হয়ে ‘করোনা নামক কুমিরকে ডেকে আনে! আর এই ভয়টাও আবার নিছক ভয়ের পর্যায়ে আটকে থাকে না । গিয়ে পৌঁছায় আতংকের পর্যায়ে । প্রশ্ন হচ্ছে এই ভয়টি আতংকের পর্যায়ের যাওয়ার দাবি রাখে কি? করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পথ ঘাটগুলি কি, অর্থাৎ ভাইরাসটি নাক দিয়ে ঢুকে শুধু, নাকি চোখ দিয়ে মুখ দিয়েও ঢুকে, দূরত্ব ছয় ফুট না বার ফুট? দেহে ঢুকে কাদেরকে কাবু করতে পারে আর কাদেরকে কাবু করতে পারেনা এ নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে দেখা দিচ্ছে ‘নানা মুনির নানা মত’। এমনকি ইউরোপ আমেরিকার করোনা আর এশিয়া আফ্রিকার করোনা, তার স্বভাব প্রকৃতি, ক্ষতি করার ক্ষমতার প্রশ্নেও উঠে আসছে নানান মত; এমনকি পরস্পর বিরোধী ভিন্ন মতও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও এসব অনেক প্রশ্নেই সময়ে সময়ে কম বেশী মত বদল করতে দেখা যায়।

করোনা সংক্রমিত হওয়ার এই ভয় নিয়ে আলোচনাটা এটুকুতে রাখা এই লেখা মূল নজর নয়। মূল নজরটি কি তা বলার আগে আরও একটি ছোট্ট গল্প। এক প্রতিবেশীর ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ শুনে অপর প্রতিবেশী তার কাছে কান্নার কারণ জানতে চাইলে তার কাছে তিনি বললেন, গতরাতে শিয়াল তার দুটি মুরগী চুরি করে নিয়ে গেছে। শুনে প্রতিবেশী বললো, আপনারতো বারিতে অনেক মুরগী রয়েছে দুটি মুরগীর জন্য কাঁদতে হয়? কান্নারত ব্যক্তিটি তখন বললো আরে ভাই শেয়ালে যে মুরগী নিয়ে গেছে তার জন্য কাঁদছি না শেয়ালে যে বাড়ি চিনে গেছে এই জন্য কাঁদছি। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিতহওয়ার আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট ভয় যা অনেক ক্ষেত্রেই অনেকের ক্ষেত্রেই রীতিমতো আতঙ্কের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে এই ভয়টা মুরগী নিয়ে যাওয়ার মতই বড় বিষয় না।শেয়ালে বাড়ি চিনে ফেলার মূল দুঃচিন্তার মতই সংক্রমনের ভয় আতঙ্কের আসল বিপদটি হচ্ছে তা ভীত আতংকিত মানুষটির মাঝে এক ধরনের দিশেহারা অস্থির ভাব অশান্ত দশা নিয়ে আসে। এর ফলে তার মধ্যে একদিকে যেমন এক ধরনের অসহায়তা, শক্তিহীনতা নিয়ে আসে অপর দিকে এই দিশেহারা অস্থির ভাব তাকে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধ করনিয় পদক্ষেপ যথাযথভাবে নেয়ার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার অসহায় শক্তিহীন দশা করোনা প্রতিরোধে জানা মানা তথা করনীয় সঠিকভাবে সম্পাদনে নিস্কিয় করে রাখে। অপরদিকে যারা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে থাকেন সেই আতঙ্ক দশা তার লিভারকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, তার স্নায়ুতন্ত্রর উপর চাপ বাড়ায় যা উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ জাতীয় জীবন ঝুঁকিপূর্ণ রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় অথবা রোগকে সজ্জাসঙ্গী করে তোলার পর্যায়ে নিয়ে যায়।

‘তাবিজ কবজ পানি পরায়ও রোগ ভালো হয়’ –

প্রশ্ন হচ্ছে করোনা ঠেকানোর আগে মনে সংক্রমিত হওয়া ভয় ঠেকানোর পথ কি? লকডাউন ভ্যাক্সিন যেমন স্থায়ী নিশ্চিত কার্যকরি উপায় না (আমার করোনা শিক্ষা করোনা বার্তা লেখা প্রবন্ধে এ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে যা আমার ফেইসবুকে দেয়া আছে) তেমনি করোনা সংক্রমন থেকে বাঁচার বর্তমানে চালু উপায়গুলোও  যেমন, মাস্ক পরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি করোনা প্রতিষেধক মোক্ষম হাতিয়ার না। মোক্ষম হাতিয়ার কয়েকটির মধ্যে আজকের লেখায় যেটি তুলে ধরেছি সেটিই হচ্ছে করোনা হওয়ার ভয়কে আগে ঠেকানো। তাহলে শহর অঞ্চল গোটা রাষ্ট্র লকডাউন করে দেয়ার মতই নিজেকে লকডাউন করে দেয়া যাবে সফলভাবে, যার ফলে করোনা ভাইরাস আক্রমন করতেই পারবেনা। করোনার সংক্রমন হবে না, করোনা দেহে ঢুকে গেলেও তা কোন ক্ষতিই করতে পারবেনা।

 বিষয়টি পরিস্কার করে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার আগে প্রাসঙ্গিক হওয়ায় প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলামের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ন অবাক-করা উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। আকুপ্রেশার চিকিৎসা নিয়ে ২০০৮ সালে ঐ সময়ের দুই টাকা মূল্যের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক ‘দৈনিক আমাদের সময়’ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে আকুপ্রেশার চিকিৎসা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশে এই চিকিৎসা পদ্ধতির পথিকৃত হিসাবে ঐসব ধারাবাহিক প্রতিবেদনে পরপর ৩দিন প্রথম পাতায় শীর্ষ দ্বিতীয় প্রতিবেদন হিসাবে (2nd lead) আমার (সাগর সগীর) সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক বক্তব্য প্রকাশিত হয়। এইসব প্রতিবেদন দেখে জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলাম আগ্রহ প্রকাশ করেন এ-নিয়ে বিস্তারিত জানার, আমার সাথে কথা বলার।

২০০৮ এর অক্টোবরে আমাদের সময়ের অফিসে আমার সৌভাগ্য হয় জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলাম স্যার এর কাছে আকুপ্রেশার চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরার। সেদিন তিনি আকুপ্রেশার চিকিৎসাটি দেশের সাধারন মানুষের জন্য, বিশেষ করে গরীব মানুষের জন্য কি পরিমান প্রয়োজনীয়  বলে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আকুপ্রেশার চিকিৎসার উপর আমার লিখিত প্রকাশিত ‘স্বচিকিৎসা প্রয়োগবিধি’ বইটির ভূমিকাতে তিনি কি কি বলেছিলেন সে সব ভিন্ন প্রসঙ্গ । এখানে প্রসঙ্গ হচ্ছে  ঐ বৈঠকে ডাঃ নূরুল ইসলাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন তাবিজ কবজ পানি পরাতেও রোগ ভালো হয়। উল্লেখ্য ঐ বৈঠকে ডাঃ নূরুল ইসলামের সাথে আলাপচারিতায় আমার সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে আকুপ্রেশার ছরিয়ে দেয়ার অভিযানে আমার সাথে কাজ করতে এগিয়ে আসা সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডাঃ মোহাম্মদ কছিমউদ্দিন, বিশিষ্ট গাইনী বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুলতানা আহমেদ, স্বনামধন্য হোমিও চিকিৎসক ডাঃ শওকত আলী ও ডাঃ মোহাম্মদ আলী এবং আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদ আল আমিন। যিনি ছিলেন ঐ ধারাবাহিকগুলির প্রতিবেদক।

তাবিজ কবজ পানি পরাতেও রোগ ভালো হয় ডাঃ নূরুল ইসলামের একথা শুনে সবিস্ময়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম ‘বলেন কি স্যার, আপনি বলছেন একথা! উনি তখন বললেন, হ্যাঁ আমি বলছি, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আসলে তাবিজ কবজ পানি পরায় রোগটা ভালো হয় না, রোগটা ভালো হয় যখন মানুষটি আস্থা জন্মানো কোন মৌলভি তথা কোন হুজুর কিংবা পুরহিত বা এই জাতীয় কোন ব্যক্তিত্ব তার কাছে হাজির হওয়া রোগগ্রস্থ মানুষটিকে কোন তাবিজ বা কোন পানি পরা দিয়ে থাকেন তখন ঐ মানুষটির মনে তাবিজ কবচ পরার কিংবা পানি খাওয়ার আগে এরূপ একটা বিশ্বাস জন্মায় যে ‘এখন আমি ভালো হয়ে যাব’। ডাঃ নূরুল ইসলামের কথা অনুযায়ী তখন তার শরীরের একটি অনাল গ্রন্থী ( Endocrine gland -যতদূর মনে পরে তিনি বলেছিলেন পিটিউটারি গ্লান্ডস-এর কথা) থেকে এক ধরনের রস (হরমোন) নিঃসৃত হয় যা তার রোগ দূর করার কারণ হয়ে থাকে। 

সুতরাং ভয়ের পরিবর্তে যখন একটা মানুষের মনে, তার চিন্তা প্রবাহে এই ধারনা প্রবল হয়ে উঠে যে আমার করোনা ভাইরাস হবে না, হতে পারে না; আর করোনা ভাইরাস না হওয়ার জন্য যা যা করনীয় তা আমি করছিও। মানুষটির এই বিশ্বাসটিই তাকে সেই ‘self lockdown’ এ ঢুকিয়ে রাখবে যেখানে, যা ভেদ করে করোনা ভাইরাস তাকে ছুতেই পারবেনা। আবার ঘটনা-দূর্ঘটনা ক্রমে ঐ ভাইরাস দেহে ঢুকে গেলেও তাকে নিস্কৃয় করে মরণ ঘুম পারিয়ে রাখবে ওর মৃত্যু পর্যন্ত। এ প্রসঙ্গে যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রাম বাংলার প্রবাদ ‘বনের বাঘে খায়না মনের বাঘে খায়’ কিংবা আধুনিক কালে বেদ বাক্যের মতই যে প্রবাদ বাক্যটি পাওয়া যায় তারও উল্লেখ খুবই প্রাসঙ্গিক। আর সেটি হচ্ছে ‘you are what you eat, you are what you think’ অর্থাৎ আপনি যা খাচ্ছেন যা খেয়ে থাকেন আপনি (আপনার শরীর) আসলে তাই অর্থাৎ সেরকমটাই হয়ে থাকে শরীর এবং আপনি আসলে যা ভাবেন আপনি কার্যত তাই অর্থাৎ আপনার ভাবনাই প্রতিফলিত হয় আপনার জীবনে। ফলে করোনা হওয়ার আশঙ্কা, ‘করোনা ভয়’ নামক খালের জলে ভেসে আসবে করোনা নামক কুমির আপনার দেহে। (চলবে)