করোনায় হচ্ছে কি বোধোদয়?

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ ।। মানুষে-মানুষে সংক্রামক ব্যাধি করোনার মহামারিতে সমগ্র বিশ্বই আজ মহাসংকটে। কভিট-১৯ নামের এক ভাইরাসের তাণ্ডবে গোটা বিশ্ব এখন তটস্থ। গত ৮মার্চ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর এরই মধ্যে তিন মাস পার হয়েছে। বাংলাদেশে ২৫ মার্চ সরকার কর্তৃক গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণার পরই মূলত এই মহামারী-পরিস্থিটা আঁচ করতে পারে দেশবাসী। একই ধরনের বা একটি মহামারী সমগ্র মানব জাতি এক সাথে মোকাবেলা করেছে- এমন নজির এর আগে পৃথিবীর কেউ কখনও দেখেনি। বিশ্বায়নের যুগ ও তথ্য-প্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রয়োগের সুবিধার কারণে বর্তমান মানবসভ্যতার কাছে এই মহামারী তাই সম্পূর্ণ এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই প্রেক্ষাপটে করোনা-সংকট মোকাবেলায় সাধারণ জনগণ ও সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাদি এবং জনজীবনে এর প্রতিফলন, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া-বাস্তবতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক ও গবেষণা প্রয়োজন।   

এই ভাইরাস ধনী-গরীব-উঁচু-নীচ-শিক্ষিত-অশিক্ষিত কাউকেই পরোয়া করছে না। বিশ্বের সবচাইতে পরাক্রমশালী রাষ্ট্র আমেরিকাসহ ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানার পর এখন ভাইরাসটির নজর যেন অপেক্ষাকৃত কম উন্নত ও স্বলোপন্নত দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা এরই মধ্যে সাড়ে ৮শ’ ছাড়িয়েছে এবং অনেকে সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। অর্থাৎ,মারণাস্ত্র, নগদ অর্থ-বিত্ত, পেশি-শক্তি, নাম-যশ কাউকেই যেন কোনো ছাড় দিতে চায় না এই ভাইরাসজনিত পরিস্থিতি। প্রকৃতির মতোই সকলের সাথে এই ভাইরাসটির  সমান আচরণ, এ যেন প্রকৃতির সমান বিচার। গত ৭ জুন রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ১ টা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে শনাক্ত হওয়া করোনায় সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ লাখ ৪০ হাজার। মৃত্যু ৪ লাখেরও বেশি।

করোনা-হামলায় জর্জরিত জনজীবনে, সচেতন মানুষের চিন্তা-জগতে নতুন নতুন উপলব্ধি জাগ্রত কথা। কিন্তু বিশেষ করে দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবাখাতের দুর্বল ও সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের অমানবিক ও নীতি-নৈতিকতাহীন  চাওয়া-পাওয়া-আবদার করোনা-সংকট মোকাবেলায় সামগ্রিক উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দিয়েছে-এসব বাস্তবতা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এছাড়া,অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা এবং ইসলামের নামে ওয়াজ-মাহফিল ও ফেসবুকে অবৈজ্ঞানিক কথা-বার্তা ও ফতোয়াবাজি সংকটের শুরু থেকেই পরিস্থিতি সামলানোর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্র ও সরকারের সার্বিক কর্মসূচির বিরাট যজ্ঞকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। মানুষ বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে বাস করে, কিন্তু বাতাস ও  অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে হলে গভীরভাবে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। ঠিক তেমনি এত বড় বিশ্বমহামারির সময়ে দেশ এবং দেশের মানুষ শত অস্থিরতার মধ্যে শান্তিতে রয়েছে সেটাও স্বীকার করতে হবে। এ জন্যএককভাবে কাউকে ধন্যবাদ দিতে হলে অবশ্যই সেটা দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকেই। দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে গত তিন মাস ধরে তাঁর পরিচালিত সকল উদ্যোগ ও কর্মকান্ডে সচেতন দেশবাসী আশ্বস্ত। এক্ষেত্রে সরকার গৃহীত যাবতীয় সকল পদক্ষেপে সমন্বয়হীনতা যতটুকু ছিল তার দায় একটি রাষ্ট্র ও তথা দেশের নাগরিক হিসেবে সকলকেই নিতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্র ও সরকার সে দেশের জনগোষ্ঠীর সকলকেই প্রতিনিধিত্ব করে। যে দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও আদর্শ অনুযায়ী শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যেখানে আজ বলা হচ্ছে দেশের অধিকাংশ সম্পদ ২২ হাজার  পরিবারের কাছে (স্বাধীনতার পূর্বে ছিল ২২ পরিবার) পুঞ্জিভূত হয়ে পড়েছে, যেখানে অশিক্ষা-কুশিক্ষা, দুর্নীতি, ভণ্ডামী, মিথ্যাচার, লোভ, হিংসা-প্রতিহিংসা সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, বিশেষ করে সমাজপতিদের মধ্যে সেখানে সরকার গৃহীত সকল কর্মসূচির সমন্বিত ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কেউই আশা করে না। তবে একজন ব্যক্তি সচেতনভাবে চলতে চাইলে,পরিস্থিতি মোকাবেলায় সচেতনতার সাথে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে সরকার সেখানে তার সহায়ক হবে-এমন পরিবেশ দেশে বিরাজমান রয়েছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

করোনা-পরিস্থিতি মোকাবেলার এ সময়টিতে  সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজে লাগাতে সরকারের সকল প্রয়াসকে স্বার্থক করে তুলতে এ মূহুর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দলমত-নির্বিশেষে সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ। কৃষক ও কৃষিখাতে সরকারের ভর্তুকি ও আন্তরিক সহযোগিতা, সমর্থন ও প্রণোদনা যত বেশি কার্যকর হবে, জনগণের নৈতিক ও আর্থিক শক্তি ততই শক্তিশালী হবে।

করোনা-পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে এখন মৃত্যুভয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসের পথে যাত্রীগণ (মোমেনগণ) কখনও মৃত্যুভয়ে ভীত হতে পারেন না। তাদেরকে তাদের প্রভুর নির্দেশিত পথে চলতে এবং লক্ষ্য পূরণে সব সময় ব্যস্ত ও সদাজাগ্রত থাকতে হয়। কর্মটাই এখানে বড়। আর এ জন্য দরকার পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের ধারায় নতুন বোধোদয় ও উপলব্ধি। একজন ব্যক্তির নিজেকে জানা ও নিজেকে চেনা। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী, ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’ , সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর বাণী, ‘নিজেকে রতনে রাখাও ইবাদত’, প্রাচীন কালের মহাজ্ঞানী সক্রেটিস-এঁর বাণী ‘নো দাইসেল্ফ’-‘নিজেকে জানো’, পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার রবকে (প্রভুকে) চিনতে পেরেছে’, কবিগুরুর বাণী-’ আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেকে করো জয়’-এ সব কিছুই নিজেকে জানার পথ প্রশস্ত করে দেয় এবং ব্যক্তিকে আস্থাবান করে তুলে যা মূহুর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিজ্ঞান বলছে, নিজের শরীরের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি (ইমিউনিটি তৈরি) করা করোনা মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই অবস্থায় মানবজাতির কঠিন বাস্তবতার এই সময়ে ব্যক্তির মধ্যে, সমাজের সুবিধাভোগী অংশ ও সমাজপতিদের মধ্যে নতুন বোধোদয় সৃষ্টি হয়েছে কি-না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।