এমন তো কথা ছিল না


নজরুল ইশতিয়াক।। এমন তো কথা ছিল না। তবু সব কথা, সব সময় পূরণ হয়না, চাইলেও পূরণ করা যায় না। কথা দিয়ে কথা রাখার ক্ষমতাও থাকে না। 

কথা তো ছিল ২১, ৪১ সালের রূপকল্প অনুযায়ী সব পেয়ে যাবো আমরা। ১০০ বছরের ডেল্টা প্লানও আলোর মুখ দেখবে কোন এক সময়। এ জন্যই রাজনীতি কিংবা সমাজিক চরিত্রের-সক্ষমতার উন্নয়নের দিকে না তাকিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকটিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সমাজে তীব্র বৈষম্য, মুর্খতা, পশ্চাৎপদতাকে রঙিন কাগজে মুড়িয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে নানা নামে। কিছু ভাতা কার্যক্রম দিয়ে ভাতের বদলে লজেন্স মুখে পুরে ঘুম পাড়ানী গান শোনানো হয়েছে। 

ফেসবুক, ইউটিউব নির্ভরতা, হুজুরের বয়ান আর নেতা কর্মীদের দাপটে ফাঁকা মাঠে একের পর এক গোল দেয়ার মহড়া চলেছে এতদিন। বিকল্প সামাজিক -রাজনৈতিক শক্তির অভাব কিংবা চেনা কিছু রাজনৈতিক দলের দস্যুপনার ক্ষত তো ছিলই মানুষের মনে। সেসব ভয়ংকর দুঃশাসনের কথা ভেবে দোদুল্যমান জনগণ মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে সব।

আপাতদৃষ্টিতে সাময়িক উন্নয়ন বিড়ম্বনাকে জনগণ মেনেও নিয়েছে। 

বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে বহু সমালোচনা, বহু কটু কথা শোনার পরও কোন দিকে না তাকিয়ে একটার পর একটা মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে, গুরুত্বপূর্ণ সেসব প্রকল্প দেশের সার্বিক উন্নয়নেই গৃহীত । এগুলোর সফল পরিসমাপ্তি হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশাল এক মাইল ফলক ছুয়ে যাবে দেশ। কিন্তু করোনা ঝড়ে বিপর্যয়ের শংকা তৈরী হয়েছে। বড় সংকট দেখা দিয়েছে।

আমরা বারবার বলেছিলাম সবার আগে দরকার রাজনীতির উন্নয়ন। রাজনীতির উন্নয়ন মানে সমাজ- সংস্কৃতি- দর্শনের উন্নয়ন। যাতে সমাজ যে কোন ঝড় সামলে নিতে পারে, একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে। সমাজিক এন্টিবডি তৈরী হয়। ব্যক্তি অর্থনৈতিক ও মানসিক ভাবে শক্তিশালী হয়। বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। দেশপ্রেমকেই অগ্রগণ্য করে দেখার সুযোগ পায়। অভ্যন্তরীণ  প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে মানুষ মানবিক হয়, সহমর্মী হয়, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীকে চিনতে পারে। সম্মিলিত ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। সরকারের যে কোন পদক্ষেপ মেনে নেয়ার জন্য উপযুক্ত হতে পারে । সামাজিক দায়বদ্ধতা দিয়ে সফল করে তুলতে পারে যে কোন জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ। 

এই করোনাকালীন সময়ে দেখা গেল সমাজ কতটা অস্থির, কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে আছে। ভাতের জন্য হাহাকার, গ্রামে ফিরছে অনেকে। কর্ম হারিয়ে ফেলছে। চাকরী বাঁচাতে জীবনকে বাজী রেখে ছুটছে। প্রনোদোনা আর প্রনোদোণা নির্ভর হয়ে পড়ছে। মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্তরা ধার দেনা করে কোন রকমে মুখ লুকিয়ে বেঁচে আছে। করোনা ঝড়ে মুহুর্তেই উন্নয়নের মহাজোয়ারে শক্ত উচু ভাটার প্রাচীর তৈরী হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে করোনা মোকাবেলায় সমাজ প্রস্ততি নেয়ার জোরালো সামর্থ্য রাখেনা। কারণ সমাজের সেই শক্তি নেই। শক্তিমান করার কাজটি হয়তো এতকাল। 

নিতান্তই গভীর এক সংকটে আমাদের সামাজিক জীবন। হাজার হাজার মাদ্রাসাগুলোকে হয়তো কিনে ফেলবে দুষ্টু চক্র। অস্থিরতার বহমাত্রিক পদধ্বনি শুনতে হতে পারে সহসাই। 

কেবল মাত্র কিছু বৃত্তশালী লুটেরা আর সরকারী কর্মকতারাই নাকে শর্ষের তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন। কারণ এরাই তো মিলেমিশে সরকার ও সমস্ত সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

এমনকি বড় কোন সামাজিক বিদ্রোহ হলে কেউ কেউ পালিয়েও যেতে পারেন বিদেশে। অনেকের সেকেন্ড হোম থার্ড হোম রয়েছে। রয়েছে ব্যক্তিগত বিমান। বিদেশের ব্যাংকে জমা রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। একই সাথে পরিস্থিতি জটিল করার মহান দায়িত্ব পালন করার চক্র তো সক্রিয় রয়েছেই। তাহলে হলোটা কি এতদিন? ফল ভোগ করার উপযোগিতা এত দ্রুত দেখা দিলো? 

আমরা যখন অবকাঠামোগত বৈষয়িক উন্নয়নের পরিবর্তে রাজনীতির উন্নয়নের কথা বলেছি, লিখেছে, তা কারো কর্নে পৌঁছায়নি এটা নিশ্চিত। হয়তো বর্তমান রাজনীতি একথার গভীরতা অনুধাবনেও অক্ষম। 

তবে বলতে শুনিছি মাহাথীর মোহাম্মদ মডেল ধরেই নাকি সরকার এগুচ্ছে।  

আমরা বলেছিলাম এটা ম্যালেয়েশিয়া না, এটা বাংলাদেশ। স্থান-কাল-পাত্র ভেদ ভিন্ন। আর সব কিছু সব সময় কারো দেখাদেখি  সফল নাও হতে পারে। 

বলেছিলাম উন্নয়নের নামে গরু মেটাতাজাকরণ করে আখেরে লাভ হবে না! আমাদের দরকার সামাজিক জাগরণ, মূল্যবোধের জাগরণ। 

জোড়াতালি দিতে দিতে এক সময় আর জোড়াতালি দেয়ার জায়গা থাকে না।

গত কয়েক বছরে ডিজিটাল ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগান বাজারজাত করা হয়েছে। আমরা প্রশ্ন তুলেছিলেম ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে কিছু হয় না। প্রযুক্তি কেবল সেবা কর্মটিতে সহায়তা করতে পারে, প্রযুক্তি কখনো মুখ হতে পারে না। মুখ থাকবে মুখের জায়গায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার আমেরিকায় এক অনুষ্ঠানে বলেও ছিলেন- কল্যাণমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। তার সেই কথাটি মোসাহেব তাবেদাররা কখনো প্রচার করেননি।

কে শোনে কার কথা। আমরা লিখে চলেছি বিবেকের বোধ থেকে সত্য প্রকাশের অনিবার্যতা থেকে। করোনা ঝড়ে যেখানে দারিদ্র্য বাড়বে, দেশে বিদেশে নতুন করে জীবন জীবিকা হারাবে ৩/৪ কোটি মানুষ। সেখানে বড় বড় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। 

প্রকৃতি এবং জীবন সব সময় রহস্যময়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই মানুষ এতদূর এসেছে। এই যে লড়াই করার ক্ষমতা এটিই মানুষের শক্তি। 

কিন্তু না খেয়ে, গাছের নিচে বসে থেকে লড়াই চলবে না। আবার আস্থাহীনতার সংকটে নেতৃত্বকে অমান্য করার বিষয়টিও কাজ করে।

একই সমাজে কেউ খাবে, কেউ জমিয়ে রাখবে, এটি মানুষ বেশিদিন মেনে নিতে পারে না। সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। 

এমন এক পরিস্থিতি তৈরী হয়, যাতে মনগড়া সব উন্নয়ন ভেস্তে যায়। বালির বাধের মতো। এটিই তো সামাজিক প্রবাহ। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন- আমার বাঙ্গালিরা সব বুঝতে পারে, কারো রক্তচক্ষুতে মাথা নত করে না। প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন- বাঙালি কিছুদিন হয়তো চুপ থাকে কিন্তু জেগে উঠে অল্প সময়েই, অধিকার আদায় করে নেয়। 

উন্নয়ন তো দর্শন। সমাজিক শক্তি, চরিত্রকে বিচার করেই তো উন্নয়ন পরিকল্পনা। 

এ জন্য তো নেতার আসন জনগণের মনে রচিত হয়। রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। রাজনীতি বাদ দিয়ে সুশাসন উন্নয়ন টেকসই হয়না। সত্য ছাড়া রাজনীতি বেশিদিন টেকে না। 

বহু আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন- বুড়োদের দিয়ে ভারত স্বাধীন হবে না।তিনি আমলাতন্ত্র কে ছাগলের সাথে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন দরকার তারুণ্য নির্ভর শক্তির। একই সাথে তিনি বলেছিলেন এই তারুণ্য শক্তি হবে সমাজ থেকে উঠে আসা, সমাজকে চেনে এমন তরুণরা।  উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে দেশ/ এখন সময় বাংলাদেশের। কথাগুলো থাকবে কাগজে কলমে। কিন্তু পথ হারাবে না বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি।