এত বড় বিপদ স্বাধীন ভারতে আগে কখনও আসেনি

সংলাপ ॥  একটি লড়াইয়ের ভিতরে আর একটি লড়াই চলছে। বাইরের লড়াই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে, দেশ জুড়ে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রবর্তনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ভিতরের লড়াই চলছে ওই বাইরের লড়াইয়ের সংজ্ঞা, ধর্ম এবং গতিপথকে কেন্দ্র করে। সিএএ-এনআরসি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন যাতে কেবলমাত্র মুসলমান সমাজের আন্দোলনে পর্যবসিত না হয়, ভিতরের লড়াই সেই উদ্দেশ্যে। ভিতরের লড়াইয়েই নিহিত রয়েছে বাইরের লড়াইয়ের প্রাণশক্তি। সেই লড়াই ব্যর্থ হলে ওই প্রাণশক্তি বিনষ্ট হবে। তা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নহে, বিপজ্জনক। সেই বিপদ অত্যন্ত বড় আকারের, কারণ তা ভারতীয় রাজনীতিকে আড়াআড়ি ভাগ করে দিতে পারে, রাজনীতির মেরুকরণ ষোলো আনা সম্পন্ন করে মেরুকরণকেই রাজনীতিতে পরিণত করতে পারে।

এত বড় বিপদ স্বাধীন ভারতে আগে কখনও আসে নাই। বিপদ এই কারণে গুরুতর যে, রাষ্ট্রনীতি নিজেই মেরুকরণের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নুতন নাগরিকত্ব আইন মেরুকরণের জমি তৈরি করেছে, সেই জমিতে অতঃপর জাতীয় নাগরিক পঞ্জির ইমারত গড়া হবে। একটি কথা বুঝে নেয়া আবশ্যক। সিএএ সত্যই কত ‘নিপীড়িত হিন্দু’কে নাগরিকত্ব দিবে এবং নাগরিক পঞ্জিতে শেষ অবধি কত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র নাম বাদ পড়বে ও তাদের গতি কী হবে, তা কেউ জানে না, শাসকেরাও জানেন না। কিন্তু, অনুমান করা সহজ, তাদের জানবার প্রয়োজনও নাই। সিএএ দেখিয়ে হিন্দুদের অভয় দিয়ে যদি তাদের বলা হয় যে, এনআরসি-র ঔষধ দিয়া ‘অবাঞ্ছিত’দের বিতাড়ন করা হবে এবং সেই ব্যবস্থাপত্রে যদি তারা সন্তুষ্ট হন, তা হলেই কার্য সিদ্ধ হবে। এই হিসাবটি পরিষ্কার বলেই বোধ করি নাগরিকত্ব আইন বলবৎ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বিরোধীরা সকলে একযোগে আপত্তি করলেও সিএএ-র বিষয়ে এক ইঞ্চি পিছু না হটবার হুমকি।

নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলন মুসলমানের আন্দোলন হয়ে উঠলে মেরুকরণের পথ সুগম হত। আশ্বাসের কথা, তা হয় নাই। এই আন্দোলন একটি বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। দেশ জুড়ে এই প্রতিবাদে সংখ্যালঘু মানুষের ভূমিকা অবশ্যই প্রবল। তা অত্যন্ত স্বাভাবিক যারা গোষ্ঠী হিসাবে বিপন্ন বোধ করছেন তারা গোষ্ঠী হিসাবেই প্রতিরোধে নামবেন। কিন্তু দুই দিক হতে এই আন্দোলন গোষ্ঠীর সীমা অতিক্রম করেছে।

এক, সংখ্যালঘু সমাজের বাহির হতেও অগণিত মানুষ গণতন্ত্র তথা সংবিধানকে রক্ষার তাগিদে জনপথে দাঁড়িয়ে ‘উই দ্য পিপল…’ পাঠ করেছেন। সংখ্যালঘুর স্বার্থ কেবল সংখ্যালঘুকেই দেখতে হবে এই জিন্না-ধর্মী সঙ্কীর্ণ মন্ত্র উড়িয়ে দিয়ে সমস্বরে ঘোষণা করেছেন হম দেখেঙ্গে! মেরুকরণের কারিগরদের মুখের উপর ইহা এক প্রচ- জবাব।

দুই, সংখ্যালঘু মানুষও তাদের প্রতিবাদকে গোষ্ঠীস্বার্থের গ-িতে বেধে রাখেন নাই, তার উত্তরণ ঘটিয়েছেন বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। শাহিনবাগের রাজপথে একটি মিছিল হতে ধর্মীয় স্লোগান উঠলে সেখানকার ঐতিহাসিক সমাবেশের আয়োজকরাই আপত্তি করেছেন এবং স্লোগানদাতারা তৎক্ষণাৎ ভুল স্বীকার ও সংশোধন করেছেন, স্লোগান বদলিয়েছে। দুই দিক হতেই সম্মানিত হয়েছে গণতন্ত্রের একটি মৌলিক শর্ত: সংখ্যালঘুর অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষা করা সংখ্যাগুরুর নৈতিক দায়িত্ব। সংখ্যাগুরুবাদের প্রবক্তা ও সেনাপতিরা এই শর্ত মানেন না। মানতে পারেন না। মানলে মেরুকরণের প্রকল্পটি ধসে পড়ে। সেখানেই সংখ্যাগুরুবাদের সাথে গণতন্ত্রের লড়াই। ভিতরের লড়াই ।