এক যুগেও কার্যকর হয়নি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ!

সংলাপ ॥ বাংলার মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন “নিজের বিচার নিজে কর রাত্র দিনে”। সচেতন ব্যক্তি ছাড়া নিজের বিচার নিজে করতে পারা যে কত কঠিন তা সবাই বুঝতে পারে। নিজের কর্মের বিচার নিজে করতে সমর্থ না হলেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব, ফ্যাসাদ, হানাহানি। আর তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় নিয়মের ব্যত্যয় হয় আর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় সকলকেই। সেখানে সবারই প্রত্যাশা থাকে ন্যায় বিচার পাওয়ার। ন্যায় বিচারের জন্য নিরপেক্ষতা নয় প্রয়োজন সত্যের পক্ষাবলম্বন। কিন্তু প্রচলিত আইনের ধারায় তা যেন এক সোনার হরিণ। ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীস্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে বিচারের নামে প্রহসন তৈরী হয়। ন্যায় বিচার বঞ্চিত হয় বিচার প্রত্যাশীরা। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য গঠিত আদালতে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকলে সেখানে ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীস্বার্থের জন্য তা প্রয়োগ করবেই। তাই প্রয়োজন নিরপেক্ষ প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত করার তাগিদেই সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়। সে মোতাবেক বিচারবিভাগ পৃথকীকরণ দিবস ছিল গত ১ নভেম্বর। কোর্টের রায়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের লক্ষ্য পূরণে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নসহ ১২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব নির্দেশনার অধিকাংশই পৃথকীকরণের এক যুগেও বাস্তবায়ন করেনি কোনো সরকার। প্রতিষ্ঠিত হয়নি বিচার বিভাগের জন্য নিজস্ব পৃথক সচিবালয়ও। ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল তার তেমন কোন অগ্রগতি আসেনি বিচার বিভাগে; বরং মামলাজট আর জটিলতা বেড়েছে দুই গুণ।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ-সংক্রান্ত মাজদার হোসেন মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা থমকে রয়েছে। তাছাড়া পৃথক সচিবালয় গঠন না হওয়ায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে সঙ্গত কারণেই। কারণ, এখনও বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নের বিষয়গুলোতে আইন মন্ত্রণালয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থ্যাৎ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে। ঢাকার বাইরে আবাসন, যাতায়াত, নিরাপত্তাসহ কয়েকটি সমস্যাও বিচারকদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। যদিও পৃথক সচিবালয় গঠন করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

তবে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, “বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক দেশেই বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় নেই। ভবিষ্যতে যাই হোক, এখন যে ব্যবস্থা বিদ্যমান, বিচার বিভাগের জন্য সেটাই ভালো। অবশ্য অধস্তন আদালতের বিচারকদের সমস্যা সমাধানে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। ‘সরকার মামলাজট কমানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তা কমানোর জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিচার কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে এবং এজলাস সংকট নিরসনে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে।”

আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘‘মামলার দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো এজলাস সংকট। এ সংকট দূর করে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ব্যবহার করে বিচার কাজে গতিশীলতা আনতে সরকার কাজ করছে। মামলা ব্যবস্থাপনার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।’’

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সময় দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ২৯১টি। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সময় ২০০৭ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন  মামলার জট ছিল পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার। গত এক যুগে এ জট বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে নয় লাখ ১৬ হাজার ৭২৯টি। অর্থাৎ প্রায় চার লাখ মামলা বেড়েছে। সার্বিকভাবে অধস্তন আদালতে অন্যান্য শাখায় মামলাজট বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ১১৭টি এবং বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৪টি। এর মধ্যে সিজেএম ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছয় লাখ ৪৮ হাজার ৬০৩টি এবং সিএমএম ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দুই লাখ ৬৮ হাজার ১২৬টি। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা নয় লাখ ১৬ হাজার ৭২৯টি।

মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুসারে সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন ও এর প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এ চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সচিবালয় নির্মাণের কার্যক্রম উদ্বোধনের জন্য দিন ও সময় চাওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সাত বছরেও চিঠির কোনো জবাব মেলেনি বলে জানা যায়।

বিচার বিভাগে কাজের পরিধি বর্তমানে অনেক বেড়েছে। এসব কাজের সবকিছুই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে দেখতে হয়। ফলে অনেকাংশে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। পৃথক সচিবালয় হলে বিচার প্রশাসন আরও গতিশীল হবে। আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। তাই যে কোনো প্রতিকারের জন্য তারা আদালতে ছুটে আসছেন। কিন্তু বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর সরকার চাইলেও এককভাবে কোনো কিছু করতে পারে না। তাই মামলাজট নিরসনের জন্য সরকার ও বিচার প্রশাসনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

কোনো রাজনৈতিক সরকারই চায়নি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক। মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য পৃথক জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করেছে। এর আওতায় এ পর্যন্ত ১২টি পরীক্ষা হয়েছে। বর্তমান সরকারের টানা তিনটি মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৮৭৬ জন সহকারী জজ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও ১০০ জন সহকারী জজ নিয়োগের কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০০৭ সালের আগে সরকারি কর্মকমিশনের আওতায় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী জজ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় অধস্তন আদালতের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র পে-স্কেল  প্রণয়ন, কয়েকটি স্তরে গাড়ি সুবিধা দেওয়াসহ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য বাজেটে বরাদ্দও বেড়েছে। যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোর জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ২৭৩ কোটি ৮২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি পদের সংখ্যা কয়েক বছরে বেড়েছে। সব মিলিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ৬৮৬টি। তবে বিচারক স্বল্পতার কারণে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা অনুমোদিত পদের চেয়ে কম। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা-সংক্রান্ত মাজদার হোসেন বনাম সরকার মামলার যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে ৩০১ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে অধস্তন আদালতে এক হাজার ৭৯০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা কাজ করছেন।

বর্তমানে দেশ সবদিক দিয়েই এগুচ্ছে। কেবলমাত্র বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সরকারের বহু অর্জন মানুষের কাছে মর্যাদা পায় না। সম্প্রতি জনগণের ফুসে উঠার কারণে কিছু মামলা দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দেশবাসীকে শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে সামান্য মামলা নিয়ে যেভাবে আদালত পাড়ায় সাধারণ মানুষকে ভুগতে হয় তা দূর করার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার বাস্তবমূখী পদক্ষেপ নেবে এই প্রত্যাশা দেশের মানুষের।