একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন এরদোগান অভিযোগ তুরস্কের ধর্মীয় নেতা গুলেনের

ardogan

সংলাপ ॥  তুরস্কে অভ্যুত্থানের পিছনে দেশের সরকার তার দিকেই আঙুল তুলে বলেছিল, শান্তি, আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে আমেরিকায় বসে কলকাঠি নাড়ছেন ফেতুল্লা গুলেন। অভিযোগের পাশাপাশি আমেরিকার প্রতি একের পর এক বিষোদগার করে মার্কিন প্রবাসী ওই তুর্কি ধর্মীয় নেতাকে প্রত্যার্পণের জন্য দরবার করেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। এবার তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সেই অভিযোগের পাল্টা জবাব দিলেন ফেতুল্লা গুলেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা এক প্রবন্ধে গুলেন বলেন, তুরস্কে যখন অভ্যুত্থানের চেষ্টা হল, তখন আমি খুব কঠোরভাবে এর সমালোচনা করেছিলাম। আমি বলেছিলাম, ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে হয়, বলপ্রয়োগ করে নয়। তুরস্কের জন্য আমি প্রার্থনা করেছি, তুরস্কের জনগণ ও যারা এই মুহূর্তে তুরস্কে আছে তাদের জন্যও, যাতে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতির সমাধান করা যায়।’ গুলেনের দাবি, তুরস্কের তিনটি প্রধান বিরোধী দলের মতো তিনিও দ্ব্যর্থহীনভাবে অভ্যুত্থান চেষ্টার সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান গুলেনকে অভিযুক্ত করলেন।

গুলেন জানান, এরদোগানের সঙ্গে তার বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব রয়েছে। গুলেনের দাবি, তার দর্শন সশস্ত্র বিদ্রোহের বিরুদ্ধে। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী ইসলামের কথা বলেন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি হিজমত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এই হিজমত হচ্ছে সেবার তুর্কি প্রতিশব্দ। এই হিজমত আন্দোলন জনগণের সমর্থন পাওয়া সরকারের পক্ষেই কথা বলে। যারা সব ধর্ম, রাজনৈতিক মত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার সংরক্ষণের পক্ষপাতী। হিজমতের মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত উদ্যোক্তা ও স্বেচ্ছাসেবীরা ১৫০টিরও বেশি দেশে শিক্ষা ও সমাজসেবায় বিনিয়োগ করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে গুলেন লেখেন, সেই ৯/১১-এ আল-কায়েদার জঙ্গি হামলা থেকে শুরু করে বোকো হারামের অপহরণ-আমরা সব ধরনের সন্ত্রাসবাদেরই বিরোধিতা করেছি। জঙ্গিদের বিরোধিতা করা ছাড়াও আমরা মুসলমান তরুণদের সন্ত্রাসবাদে জড়িত না হওয়ার উপদেশ দিই। একই সঙ্গে আমরা শান্তিকামী ও বহুত্ববাদী মন গড়ে তোলায় জোর দিই।

গুলেন বলেন, সারা জীবন ধরেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছি। বস্তুত বহু বছর ধরে আমি গণতন্ত্রের দাবি করে আসছি। তুরস্কে গত চার দশকে চারটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, আমি নিজেও যার নিপীড়নের শিকার হয়েছি, ফলে আমি চাই না, তুরস্কের নাগরিকেরা আবারও সেই দুর্দশা সহ্য করুক। হিজমতের কোনও সদস্য যদি অভ্যুত্থানচেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তিনি আমার চিন্তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আর এরদোগান যে আমার দিকে আঙুল তুলেছেন, তাতে কিন্তু বিস্ময়ের কিছু নেই। তার কর্মকা-ে বোঝা যায়, তিনি ক্রমেই একনায়ক শাসনের দিকে এগোচ্ছেন।

গুলেনের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট এরদোগান আবার আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটে তার দেশের সমর্থন কমিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেল করছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। তুরস্কে যে এরদোগানের সরকার একনায়কতন্ত্রের পথে হাটতে শুরু করেছে, তাতে দেশের জনগণ ধর্মে-ধর্মে, জাতিতে-জাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এতে গোঁড়া, কট্টর মানুষদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে।

অপরদিকে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান তুরস্কের সব সামরিক একাডেমি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এ ঘোষণার পাশাপাশি বলেছেন, এখন থেকে সমস্ত কমান্ডার সরাসরি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করবেন।

তুরস্কের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এরদোগান বলেন, সামরিক বাহিনীকে পূর্ণাঙ্গভাবে বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, দেশের সামরিক একাডেমিগুলোকে জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হবে।

এরদোগান বলেন, ‘আমরা জাতীয় সংসদে ছোট্ট একটি সাংবিধানিক প্যাকেজ পাস করতে যাচ্ছি যার মাধ্যমে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা এমআইটি এবং চিফ অব স্টাফকে সরাসরি প্রেসিডেন্ট অধীনে আনা হবে। এছাড়া, দেশের পুলিশ বাহিনীতে নিয়োজিত সেনা সদস্যের সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে এবং পুলিশকে আরো উন্নত অস্ত্র দেয়া হবে।’

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এ সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন, তাকে যারা নানাভাবে অপমান কিংবা বিদ্রুপ করেন তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নেয়ার জন্য এরইমধ্যে আইনজীবীরা কাজ শুরু করেছেন। এরদোগানের পক্ষ থেকে শত শত মানুষের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।