আসুন, আজ থেকে মাতৃভাষায় সম্বোধন করে কথা বলি

সংলাপ ॥ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার আমরা অনেকে এখনও বলে থাকি যে, অফিসের চিঠিপত্র বাংলায় লিখতে কষ্ট হয়। কথা বলতেও অসংখ্য ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করি যার কোনও প্রয়োজন নেই এবং বাংলায় অনেক সুন্দর সুন্দর শব্দ থাকা সত্ত্বেও। সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, উপবিভাগ, কোর্ট কাছারীসহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদালতে ইংরেজীতে ‘নোট’ লেখা হচ্ছে, আর কথাবলার সময় ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলার বিষয়ে উল্লেখ করার তো কোনও অপেক্ষাই রাখে না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণ ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলে থাকেন। এমনকি সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ, সাংবাদিক ভাইয়েরা, সন্মানিত সংসদ সদস্যবৃন্দ, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়গণ, আর যারা টেলিভিশনে ‘টক শো’ অনুষ্ঠান দেখে থাকেন তারা তো অবশ্যই শুনেছেন ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলার প্রতিযোগিতা। গৃহকর্মীরা পর্যন্ত কথা বলার মধ্যে ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

বিদেশে বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিতরা কিছু কিছু ইংরেজী শব্দ শিখে বাচ্চাদের সাথে কথা বলার সময় ব্যবহার করে থাকেন। ওই বাচ্চারা যখন বিদেশে স্কুলে পড়ার পর ওই দেশীয়  ইংরেজীতে কথা বলায় অভ্যস্থ হয়ে উঠছে তখন বাসায় গিয়ে মা বাবার সাথে ইংরেজীতে কথা বলতে গিয়ে অসহায় বোধ করছে। ছেলে মেয়েরা ও মা বাবারা ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। সে সময় মা বাবারা ছেলে-মেয়েদের শুদ্ধ বাংলা শেখানোর গুরুত্বটা এবং প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এইরকম ইংরেজী বাংলা মিশায়ে কথা বলার ঢংকে উন্নত মানের পরিচায়ক বা জাতে ওঠার মানদন্ড হিসেবে আবার অনেকে  দেখেন।

আমাদের গর্ব যে, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এখন জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসাবে বিশ্বে স্বীকৃত এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালিত হয়। আমাদের আরও গর্ব যে, বিশ্বের সর্বাধিক কোনও ভাষায় কথা বলার দিক দিয়ে বাংলা ভাষার স্থান ৪র্থ। অর্থাৎ চীনা, স্প্যানিশ ও ইংরেজীর পরেই বাংলার স্থান।

বাংলার মধুকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজ দেশ ত্যাগ করে বিদেশ চলে গেলেন এবং সেখানে হেনরিয়েটা নামে এক ফরাসী মহিলাকে বিয়ে করে বসবাস করছিলেন। কিন্তু কিছুদিন বিদেশে অবস্থানের পর তিনি উপলব্ধি করলেন তিনি তাঁর মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি গুরুতর অন্যায় করেছেন। সেই উপলব্ধিতে তিনি অনুতপ্ত হৃদয়ে লিখলেন :

হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত,করিনু ভ্রমণ

পরদেশে,ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি!

অনিদ্রায়,অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ,

মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;

কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন!

স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে,

‘ওরে বাছা,মাতৃকোষে রতনের রাজি,

এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?

যা ফিরি,অজ্ঞান তুই,যারে ফিরি ঘরে’।

পালিলাম আজ্ঞা সুখে,পাইলাম কালে

মাতৃভাষা-রূপ খনি,পূর্ণ মণিজালে’।

তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন এবং বাকী জীবন অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচনার পর বাংলার মাটিতেই মৃত্যুবরণ করেন।তার নিজস্ব বাড়ী বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদের তীরে যশোরস্থ সাগরদাড়িতেই তিনি চির নিদ্রায় শায়িত আছেন৷

আমরা শিক্ষিতরা একটু চেষ্টা করলেই আমাদের জাতীয় স্বার্থে সর্বস্তরে বাংলা বাস্তবায়ন করতে পারি। আমরা যখন ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলি তখন ইচ্ছে করলে বুঝতে পারি যে আমরা অনাবশ্যক ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করছি। তখন আমরা তাৎখনিকভাবে তা সংশোধন করে নিতে পারি। অথবা অন্য কাউকে যখন বলতে শুনি তখন তাকে সংশোধন করে নিতে সবিনয় অনুরোধ জানাতে পারি। তাতে লজ্জার কিছু নেই। তা ছাড়াও যদি জাতীয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক ও টুইটার সহ সকল প্রচার মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়, যেভাবে বলা হতো – স্বদেশী পণ্য কিনে হও ধন্য বা ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট  ইত্যাদি। বিষয়টিকে রাজনৈতিক ভাবে একটা সামাজিক আন্দোলনে রুপদান করা হলে কাংখিত ফল লাভ হবেই  তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আসুন, আজ থেকে আমরা কুশল বিনিময়ে সতর্ক হই এবং একে অপরকে মাতৃভাষায় সম্বোধন করে  কথা বলি।