আমি বাঙালি আমাকে বাঁচতে হবে….

সংলাপ ॥ ‘অন্য কোন দর্শন নয় – আমি বাঙালি আমাকে বাঁচতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হয়ে’- উক্তিটি বাংলার একজন সূফী সাধকের। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি উচ্চারণ করেন – আজকের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি পেতে বাঙালিকে চিন্তা ও মননে বাঙালি হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাঙালির জীবন চলার পথে আজ আর বাঙালির দর্শন নেই, আছে জগাখিঁচুড়ি। নেই তার জাতীয়তাবোধের আত্মশক্তি ও সাহস। যা দ্বারা একদিন সে শিরদাঁড়া সোজা করে বৈশ্বিক চেতনা ধারণ করতে পেরেছিল। আজকের বাঙালিকে ইতিহাসের ধারায় খুঁজে পাওয়া কিংবা চিনে নেয়া কষ্টকর। তার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ব্যাপ্তি ক্রমাগত ধর্মজীবীদের এবং রাজনৈতিক বেনিয়াদের হাতে লুন্ঠিত হতে হতে আজ এক ক্ষীণ দীপ শিখা মাত্র।

এ জন্যেই সূফী সাধক উপদেশ দিলেন সর্বাগ্রে একজন বাঙালি হবার। এই বাঙালি দর্শনেই নিহিত আছে রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি। একজন মানুষ তার নিজের মধ্যে আপন স্বকীয়তার অস্তিত্ব অনুভব করতে না পারলে, অন্যের উপস্থিতিটা তার কাছে অনুপস্থিতিই থেকে যায়। তখনই দেখা দেয় আমিত্বের আবরণে সর্বস্ব গ্রাস করবার পাশবিক মনোবৃত্তি। যা আজ আমাদের রাজনৈতিক ধারাগুলোর মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। 

এখন বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতিক পছন্দ করে না কিন্তু নির্বাচন আসলে সে যে কোন রাজনীতির সাময়িক বাহক হয়ে উঠে। এর বাইরে বেরিয়ে বাঙালি দর্শন এবং তার সংস্কৃতির চেতনায় ধারক হতে চায় ক’জনা? সুতরাং দেশ এবং তার মানুষের জন্য আর কেউ কোন দরদ অনুভব করে না। রাজনীতিকরাই দেশের মানুষকে ব্যবহার করে চলছে শুধুই তাদের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে। যদিও এদের অনেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাইনবোর্ডটি যথাযথই ঝুলিয়ে রেখেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। স্বাভাবিক প্রশ্ন এই জাতীয়তাবোধ যা আজ নির্বাসিত হওয়ার পথে, তার প্রতিষ্ঠার পথ এবং পদ্ধতি কি?

আধিপত্যবাদী রাজনীতির প্রয়োজনে যে সন্ত্রাসের সৃষ্টি তা এখন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। তাকে কি ভোটতন্ত্রের বর্তমান পথ এবং পদ্ধতিতে জিইয়ে রেখে পরিবর্তনের আদৌ সম্ভাবনা আছে? যারা আজ বুদ্ধিজীবী সেজে পুরো দেশটাকে তাদের নিজেদের মতো করে ইজারা নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের নির্লজ্জতা কত নগ্ন তার প্রমাণ পাওয়া যায় দেশের রাজনীতিকদের ও তাদের পোষ্যদের সন্ত্রাসের পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রচারে।  

সমগ্র দেশব্যাপী আধিপত্যবাদী বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ সদস্য, নাগরিক সমাজ সদস্য ও ধর্মজীবী সমাজ সদস্য সমন্বিত স্বার্থবাদী একটা শ্রেণীর দৌরাত্ম্য চলছে। অন্তর থেকে এরা কেউই আর এই দেশ এই মাটি এই মানুষের কেউ নয়। এরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ও গোষ্ঠীস্বার্থে মোহাচ্ছন্ন এবং বাঙালি ও তার জাতীয়তার আজন্ম শত্রু। এদের অভিন্ন ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের কাছে বাঙালির জাতীয়তাবোধ বার বার উপেক্ষিত।

একদিকে আকাশ সংস্কৃতির ক্রমাগত আগ্রাসন অন্যদিকে আধিপত্যবাদী সন্ত্রাসী রাজনীতির ব্যাপক বিস্তার, জাতির ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। এখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে গিয়ে হয় নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে অথবা নিজেকে পরিবর্তিত করছে একজন রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ক্যাডার হিসেবে।

এই বাস্তবতায় বাঙালি জাতীয়তা-বোধে দেশ গড়ার সত্য ও সহজ পথ – সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে বিপ্লব। একদিকে রাজনীতিকদের মিথ্যাচার এবং প্রবল প্রতাপে প্রতিটি জনপদের অসহায় মানুষের নির্বিকার ক্রন্দন, অন্যদিকে শান্তি ধর্মের নামে আমাদানিকৃত মধ্যপ্রাচ্যের জীবনাচার ও সন্ত্রাস দ্বারা মোহাবিষ্ট করে বাঙালির বাঙালিত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। এই সাড়াশি আক্রমণের প্রক্রিয়ায় বাঙালির সহজ সতেজ সবল চিন্তার সূত্রগুলো প্রতিদিন মরে যাচ্ছে। পৃথিবীর অধ্যাত্মচিন্তা ও চিরন্তন প্রেরণা বাণীসমূহ বাঙালি মানসে আর কোন আলোড়ন তুলছে না ভোগ, লোভ আর স্বার্থের আবর্তে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণায়মান সমাজে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রতিঘাতের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপেই হবে বাঙালির পূণর্জাগরণ শুরু। সামাজিক বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অর্থনৈতিক শোষণ, আধিপত্যবাদী আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক মুক্তি প্রতিটি স্তরেই জাতীয়তাবোধের অদম্য ইচ্ছা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রেমের প্রজ্ঞায় প্রজ্ঞায়িত হওয়ার জন্য সত্যমানুষের পথে চলার এখনই সময়। কর্মে অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা বহমান বাঙালিত্বে প্রতিষ্ঠিত করবার ডাক বর্তমান সময়ের বিচারেই সংজ্ঞায়িত। নিজের রূপে বিশ্বরূপ প্রতিফলিত করবার অহংবোধ বাঙালিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একমাত্র পথ।

মাত্র দুই-তিন লক্ষ ধর্মীয় আধিপত্যবাদী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিক এবং তাদের পোষ্য সন্ত্রাসীদের জন্য সমগ্র দেশের মানুষকে শান্তির জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে, এটা একেবারেই অবাস্তব। সুতরাং বাস্তবতা হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে জাতীয়তাবোধ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জাগ্রত রাখা। পাঁচ হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যকে আবার তার স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত ও বহমান রাখতে সত্যের দ্বারা মিথ্যার প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই। প্রশাসন, রাজনীতি এবং শোষণের শ্রেণীবৈষম্য প্রত্যেকেই একে অপরের পরিপূরক বিধায় এরা প্রত্যেকেই আজ সাধারণ মানুষের শত্রুতে পরিণত। অধিকার আদায়ের গতানুগতিক আন্দোলনে বারবার সুবিধাবাদী চরিত্রের উদ্ভব ঘটছেই এবং তা বিগত ইতিহাসের মতোই পুনরাবৃত্তি হবে মাত্র।

লড়াইটা এখন বাঙালির। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে আধিপত্যবাদী ধর্মীয় শোষণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রাজনৈতিক শোষণের ব্যবস্থাদিও। তারপরও ঐক্যবদ্ধ সাধারণ মানুষের সামনে তা অত্যন্ত নগণ্য। সত্যমানুষের দর্শনে ‘আমরা বাঙালি – চির নতুন ও শাশ্বত’ এই আহ্বান ধারণ করাই বাঙালির আজকের প্রজন্ম ও নতুন প্রজন্মের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ।