আজকের তথ্যপ্রযুক্তি – ৪

মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান ॥ মানবিক গুণাবলীতে গুণান্বিত এবং জনপ্রশাসন পদক প্রাপ্ত সরকারের সিনিয়র সচিব জনাব এন এম জিয়াউল আলম পিএএ আইসিটি মন্ত্রণালয়ের ৫টি অধিনস্ত অফিস, ৩১ টি প্রকল্প এর প্রায় ৫০০০ অফিসার ও কর্মচারী নিয়ে এক বিশাল কর্মী বাহিনী নৌকায় তুলে ডিজিটাল বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সকলের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলতে পারা যে একটা আর্ট তা স্যারকে না দেখলে অনুধাবন করা যায় না। অনেকের মতে বর্তমান সময়ের বুরোক্রাটদের মধ্যে অন্যতম সচিব তিনি। বিনয়ী শান্ত-শিষ্ট নম্র-ভদ্র অথচ কাজে কঠোর এই চৌকশ কর্মকর্তা সকলের প্রিয়ভাজন। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী অথবা মাননীয় উপদেষ্টা কিংবা মন্ত্রী মহোদয় সকলের কাছেই তিনি অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ও বিশ্বস্ত। এ কারণেই তিনি চাকুরীর সর্বোচ্চ সম্মান জনপ্রশাসন পদক অর্জন করেন। তিনি আমাদের গর্ব আমাদের দেশের গর্ব।

জনাব এন এম জিয়াউল আলম পিএএ, বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিভাগে প্রথমে তিনি সচিব হিসেবে যোগদান করেন। এর পূর্বে তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) হিসেবে কাজ করে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তার আগে তিনি ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি বিসিএস-৮৪ ব্যাচের একজন কর্মকর্তা।

জনাব জিয়া দেবিদ্দার উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামে ১৯৬২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি এক উচ্চবিত্ত এবং উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আব্দুল মান্নান হাই স্কুলে অংকের শিক্ষক ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং তিন কণ্যার গর্বিত পিতা।  অনার্স ও মাস্টার্স করা উচ্চ শিক্ষিত স্ত্রী ফেরদৌস আরা বেগম পিসফুল হাউজ ওয়াইফ। বরুরা উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার ডেপুটি ডিরেক্টর মরহুম সিদ্দিকুর রহমান এর পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই ফেরদৌস আরা শিক্ষাজীবনে বিএডও করেছেন। এই সুখী দম্পতি যেমন ব্রিলিয়ান্ট তাদের তিন কন্যা প্রমি প্রাপ্তি ও প্রিয়ন্তিও লেখাপড়ায় অনেক ভালো। টিভি দেখা ও অফিসের কাজ করাই তার প্রিয় বিনোদন। জনকল্যাণই তার জীবনের লক্ষ্য।

শিক্ষাজীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি সহকারী কমিশনার হিসেবে ১৯৮৬ সালে জামালপুর ডিসি অফিসে যোগদান করেন। চাকুরীর ধারাবাহিকতায় তিনি খুলনার জেলা প্রশাসক ও সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে জনাব আলম বিভিন্ন সভা, কর্মশালা, সেমিনার, মেলা, দেশ ও বিদেশে বাণিজ্য বিষয়ে আঞ্চলিক, দ্বি-পাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি সাফটা, বিমসটেক এবং আপটা সমঝোতা বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন এবং এসব আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির মন্ত্রিসভা বৈঠকে যোগ দেন। তিনি বিদেশে জিটুপি, ওপেন গভর্নমেন্ট ডেটা (ওজিডি), টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং সিআরভিএস সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও যোগ দেন। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ), জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল (এনআইএস), এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) প্রস্তুত,পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে `Collaborative Solution: Innovation in Governance ‘ শীর্ষক কোর্সে অংশ নেন। দেশে বিদেশে বেশ কয়েকটি পেশাদার প্রশিক্ষণও নেন তিনি। কর্ম উপলক্ষ্যে তিনি থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, স্পেন, তুরস্ক, পর্তুগাল, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, সৌদি আরব, বাহরাইন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, জাপান, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাস এবং কেনিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেন। তিনি স্পিকার/প্যানেলিস্ট হিসাবে বিভিন্ন সেমিনার এবং কর্মশালায় যোগ দেন। আইটি বিষয়ে তিনি বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণও প্রদান করেন।

২০১২ সালে সিলেট বিভাগের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘জাতীয় উদ্ভাবন পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। ২০১৩ সালে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় থেকে ‘জনপ্রশাসন পদক (পিএএ)’ পুরষ্কার প্রাপ্ত হন। এছাড়া সম্প্রতি তিনি জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল পুরষ্কারে ভূষিত হন।

মাননীয় মন্ত্রীমহোদয় জনাব জুনায়েদ আহমেদ পলক এর  সাথে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন সিনিয়র সচিব জনাব এন এম জিয়াউল আলম। তার কাছে সকলের রয়েছে ইজি একসেস। স্টাফদের প্রমোশন, নিয়োগ কিংবা পাওনা পরিশোধ অথবা কোন সুযোগ সুবিধা প্রদানে তিনি কখনও সময় ক্ষেপন করেন না। সচিব মহোদয়ের সাথে যারা নিবিড়ভাবে কাজ করেন অতিরিক্ত সচিব প্রজেক্ট এক্সপার্ট জনাব মো: মামুন আল রশিদ, মো: খায়রুল আমিন, মোহাম্মদ শামসুল আলম। আরও আছেন আইটি জ্ঞান সমৃদ্ধ জনাব ড.খন্দকার আজিজুল ইসলাম, অভিভাবক সুলভ জনাব মো: আব্দুস সাত্তার সরকার – যুগ্মসচিব। নিচে থেকে যারা পিলার হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন তারা হলেন উপসচিব পদমর্যাদার রাজা মুহাম্মদ আব্দুল হাই, তবিবুর রহমান, ইসরাত জাহান, মনোয়ার মোরশেদ, গোলাম মোহাম্মদ ভূইয়া, হাসিনা বেগম, সাবেত আলী, জিল্লুর রহমান, আসপিয়া আক্তার প্রমুখ। সৌভাগ্যক্রমে আমিও এই দলের একজন কর্মী। 

জনাব জিয়াউল আলম স্যার যখন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার তখন আমার সৌভাগ্য  হয়েছে স্যারের সাথে শ্রীলংকা সফরের। ৭ দিনের সেই সফরটি ছিল অদ্ভূত এবং উজ্জ্বল এক অভিজ্ঞতা। আমাদের সাথে ছিলেন তখনকার যশোরের ডিসি জনাব মোস্তাফিজুর রহমান – বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের চৌকশ এই কর্মকর্তা এখন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও দেশের একজন আইটি ব্যাক্তিত্ব। ১০ম ব্যাচের আরও একজন চৌকশ কর্মকর্তা জনাব অমিতাভ সরকারও যিনি বর্তমানে বরিশারের বিভাগী কমিশনার, ছিলেন আমাদের সাথে শ্রীলংকা সফরে। জিয়াউল স্যারের নেতৃত্বে এই অল্প সময়ে ভ্রমণ, জ্ঞান অর্জন, আনন্দ করা সবকিছুই আমরা করেছি। আর তখন থেকেই আমি সহ অনেকেই স্যারের ভক্ত হয়ে গেছি। এখনও মনে আছে জিয়াউল আলম স্যার ফেরার আগেরদিন রাতে কলোম্বো থেকে ভাবী এবং মেয়েদের জন্য অনেক দাম দিয়ে অনেকগুলো মুক্তার মালা যতœ করে কিনেছিলেন। আমি কিনতে পারি নাই তবে অভিভূত হয়েছিলাম।

সরাসরি আইসিটি বিভাগের তত্বাবধানে এটুআই প্রকল্প, মোবাইল গেম এন্ড এপ্লিকেশন, লার্নিং এন্ড আর্নিং সহ পার্লামেন্ট বিষয়ে একটি প্রকল্প চলছে। আমরা কাজ করি অনেক তবে আমাদের প্রচারণা অনেক কম। আমাদের মন্ত্রনালয়টি আইসিটি টাওয়ারে অবস্থিত। ১৫ তলা বিল্ডিং এর নকশা ও স্থাপত্যশৈলী সত্যিই চমৎকার। সরকারী অফিসের ডেকোরেশন যে এত সুন্দর হয় তা না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন। এভবনে প্রবেশ করলে যে কেউই অভিভূত হবেন- মনে হবে আপনি ইউরোপ কিংবা অষ্ট্রেলিয়ার কোথাও আছেন। এখানে হার্ড ফাইলে কোন নথি আসে না- সবকিছুই ই-নথিতে সম্পন্ন হয়। নথি উপস্থাপন, পত্র জারি, পত্র গ্রহণ, ভিডিও কনফারেন্সিং, জুম মিটিং সবই হয় ডিজিটালী। লাল ফিতা এখানে হারিয়ে গেছে। এখানে ব্যাকডেটে কোন কাজ করার সুযোগ নাই।

সিলিকন ভ্যালীর আইডিয়াকে মাথায় রেখে সারাদেশে ২৮টি  হাইটেক পার্ক/ সফটওয়ার টেকনোলজি পার্ক/ GovernanceIT training & Incubation centre প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে অন্য গুলোর কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এখানে তরুণ তরুণীদের আইটি প্রশিক্ষণ ও কাজ দেয়া এবং দেশী বিদেশী আইটি বেজড প্রতিষ্ঠানকে ইনভেস্ট করার সুযোগ দেয়া হয়। ওয়ান স্টপ সার্ভিস এর মাধ্যমে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। আরও থাকছে-পার্ক ডেভেলাপারের জন্য ১২ বছর পর্যন্ত পর্যায় ভিত্তিক ট্যাক্স মওকুফ, আইটি পন্য রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্যাক্স কওকুফ। ১০ বছরের জন্য আয়কর মওকুফ। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১০০% মালিকানার সুযোগ। জমি বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প শুল্ক ছাড় দেয়া হচ্ছে। এগুলো প্রতিষ্ঠা হলে আশা করা যায় বাংলাদেশে ২৮টি সিলিকন ভ্যালী তৈরী হবে। যে টিম এখন কাজ করছে তাতে অল্পদিনেই আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হবো- ইনশাআল্লাহ।

‘তথ্য ও সেবা সবসময়’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে কল সেন্টার চালু হয় : ৩৩৩ তে কল করে দেশের অভ্যন্তরে সকল প্রকার সরকারী সেবা ও তথ্য পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে যে কোন সরকারী অফিসের ফোন নম্বর, ঠিকানা, সরকারী সেবা প্রাপ্তির পদ্ধতি, পর্যটন সম্পর্কীত তথ্যাবলী পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কীত তথ্য জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে শেয়ার করা যায়। বর্তমানে করোনা চিকিৎসায় টেলিমেডিসিন এর ব্যবস্থাও হয়েছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জাতীয় ইমারজেন্সি সার্ভিস ৯৯৯ চালু করলে এটি দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। পরবর্তীতে এটি হোম মিনিস্ট্রিকে হস্তান্তর করা হয়। ৯৯৯ ইমারজেন্সি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে দেশের সকল নাগরিকের জন্য জরুরী পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও এ্যামবুলেন্স সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

আরও যেসব সেবা দেয়া হচ্ছে :

– ১০৬ দুর্নীতি দমন বিষয়ে কল করা।

– ১৬২৬৩ জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নে ২৪ ঘন্টা ডাক্তারের সাথে কথা বলা।

– ১৬১২৩ কৃষি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ে যে কোন সমস্যার তাৎক্ষনিক পরামর্শ।

– ৩৩৩১ কৃষি বিষয়ক যে কোন সেবা ও পরামর্শের জন্য।

– ১০৫ জাতীয় পরিচয় পত্রের তথ্য জানতে ।

– ১৩১ ট্রেনের খবর জানতে।

– ১০৯৮ সুবিধা বঞ্চিত নির্যাতিত ও বিপদাপন্ন শিশুদের ২৪ ঘন্টা জরুরী সহায়তা।

– ১০৯/১০৯২১ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল।

– ১৬১০৮ মানবাধিকার সহায়ক কল সেন্টার।

– ১৬৪৩০ দুস্থ ও দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা প্রদান।

– ১০০ বেসরকারী ফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সেবা না পেলে অভিযোগ।

সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহে সেবা সহজলভ্য করার কারণে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের সেবা সহজ ও স্বল্প মূল্যে সরবরাহ করে বা করতে বাধ্য হয়। এটাও দেশের জন্য অনেক বড় সফলতা। সিনিয়র সচিব জনাব জিয়াউল আলম স্যারের নেতৃত্বে সকলের প্রচেষ্টায় মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের উদ্যোগ উদ্দীপনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে মাননীয় উপদেষ্টা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। (চলবে)