‘আঙ্কেল আপনি কি হিন্দু’! কোথায় আমরা! কোন অভিমুখে!!

 সাগর সগীর

ফেইসবুকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি আমি অন্তত দু’জনের কাছ থেকে। সম্বোধন থেকে পরিস্কার যে এরা বাঙ্গালি মুসলমান তরুন প্রজম্মের প্রতিনিধি। একই ধরনের আরও প্রশ্ন ধেয়ে আসছে। এর উত্তর দেয়াটা এখনি প্রয়োজন মনে হওয়ায় এই লেখা। ফেইসবুক কমেন্ট বক্সে আমার ফেইসবুক কাভার ফটোর প্রেক্ষিতে করা প্রশ্ন ছিলো এটি।

 এনিয়ে প্রয়োজনীয় বিশদ উত্তর দেয়ার আগে প্রশ্ন কর্তাকে তাৎক্ষনিক কমেন্ট বক্সে যে উত্তর দিয়েছিলাম সেটা আগে উল্লেখ করে নেই। উত্তর হিসাবে আমি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, স্যুট কোট পরা কাউকে দেখে (যদি জানা মতে তিনি বাঙ্গালি এবং/ অথবা বাঙ্গালি মুসলমান হন) তাকে কি জিজ্ঞেস করা যায় যে ‘ আপনি কি খৃষ্টান, আপনি কি ইহুদি ?’ অথবা কি জিজ্ঞেস করা যায় ‘আপনি কি বৃটিশ, আপনি কি ইউরোপিয়ান? আমেরিকান? কানাডিয়ান? ওয়েষ্টার্ন কেউ? প্রশ্নকর্তাকে অবশ্য এই প্রশ্নটি তাৎক্ষনিক করিনি যে  আপনি কি আপনি কি বৃটিশ? আমেরিকান? কারণ, তার প্রশ্নটাই ছিলো হুবহু ‘আঙ্কেল আপনি কি হিন্দু?’ একজন বাঙ্গালি আরেকজন বাঙ্গালিকে প্রশ্ন করছে অথচ সম্বোধন করছে ‘আঙ্কেল’! না বললো চাচা, না বললো মামা, বা না বললো ভাই!

মুর্তি নয় ভাস্কর্য –

আমার প্রোফাইল পিকচারের পেছনে দাঁড়িয়ে স্বামী বিবেকানন্দ, এ নিয়েও প্রশ্ন পেছনে মূর্তি কেন? তাৎক্ষনিক উত্তরে যা বলেছিলাম আরও একটু বিশদ করে এখানে তা উল্লেখ করছি ‘মুসলমান’ ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত এবং মার্কিনি প্রভুদের নির্দেশে ইরাকের ‘মুসলমান’ ক্ষমতাসীনরা ও তাদের পুতুল বিচারকরা ফাঁসিতে হত্যা করেছিলো ‘বাপের ব্যটা সাদ্দাম’কে (বাংলাদেশে গর্বের সাথে তাই বলা হতো, অন্তত এক শ্রেনীর মুসলমানদের মুখে)। সেই সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকের রাজধানী বাগদাদে স্থাপন করা সাদ্দামের সুউচ্চ ‘মুর্তি’ দড়ি বেঁধে টেনে নামানো হয়, গুঁড়ানো হয়। বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বৃহৎ সংগঠনের সেই সময়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং দেশে ইসলাম ধর্মের অন্যতম রক্ষক দাবীদার দৈনিক ইনকিলাব ‘মাওলানা’ মান্নান ছিলেন সাদ্দামের ‘বান্ধা কাষ্টমার’ এর মতই নিয়মিত ইরাকের রাষ্ট্রীয় অতিথি। জনাব মান্নান ছাড়াও দেশের সে সময়ের অনেক নাম করা সাধক কবি নজরুলের ভাষায় ‘মৌ-লোভী’র দলও একইভাবে সাদ্দামের জামাই আদরে আপ্যায়িত হতেন। এদের একজনকেও দেখা যায়নি, শোনা যায়নি সাদ্দামের ‘গর্হিত পাপ’ (!) এই মুর্তি স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন করতে, দেশে ফিরে নিন্দা করতে কিংবা একবার দেখে এসে ওমুখি আর না হওয়ার ঘোষনা দিতে। সাদ্দামের নিজ দেশে শীর্ষ স্থানীয় কোন মুসলিম ধর্মীয় নেতারাও এর বিরোধীতা করেছেন বলে শুনা যায়নি, জানা যায়নি। নিদেন পক্ষে তার প্রতিবাদ করে একজন ইরাকি ধর্মীয় নেতাও সাদ্দামের রোষানলে পড়েছেন, জেলে গিয়েছেন, অথবা অন্তত ‘মুর্তি’ পাপের প্রতিবাদে প্রতিবাদী হয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন তেমন কোন খবরও পাওয়া যায়নি।

আসলে ‘ মুর্তি’ গড়তে দিয়ে সাদ্দাম কোনই পাপ করেননি অথবা সে দেশে এর প্রতিবাদ না করে কেউই পাপী  হননি। কারন ওটি ছিলো ‘ মুর্তি’ নয় ভাস্কর্য। চলতি ধর্মীয় ব্যাখায় বলতে গেলে (যা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষিত মোল্লাদের কাছ থেকে জানা যায়)  পূজা করার উদ্দেশে তা না নির্মিত হয়েছিলো না স্থাপিত হয়েছিলো। ওটা ছিলো শিল্প। শিল্পে ভাস্কর্যে না আছে কোন পাপ, না আছে কোন কদর্যতা, কিংবা না আছে কোন নোংরামি বা অশ্লীলতা। কিন্তু একথা কে বলবে কাকে বলবে? কে শুনাবে কাকে শুনাবে? যাকে বলবে যাকে শুনাবে তারা যে ‘মৌ-লোভী’ মতলবী  ধর্মজীবি  ধর্মব্যবসায়ীদের ‘মতলবী বয়ান’- এ বেঁহুশ হয়ে আছে, হয়ে চলেছে – বছর বছর নয় যুগ যুগ নয় শতক শতক ধরে! সাধক নজরুল প্রায় শত বছর আগে গভীর খেদে বলেছিলেন ” বিশ্ব যখন এগিয়ে চলে আমরা তখন বসে/ স্ত্রী তালাকের ফতোয়া খুঁজি ফেকা হাদিস চষে”।

আগে মানুষ না আগে মুসলমান না আগে হিন্দু-

প্রশ্নকর্তাকে এ প্রশ্নটিও করা হয়নি, যা বড়ই আফসোসের,  কোন্ প্রশ্নটি আগে তোলা উচিত,আগে তোলা জরুরী অথবা দরকারী – ‘আপনি আগে  একজন মানুষ না আগে  একজন মুসলমান কিংবা একজন হিন্দু’? একজন লোক হিন্দু বা মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ বা খৃষ্টান যাই হোক না কেন প্রতিষ্ঠানের সমাজের রাষ্ট্রের এমনকি খোদ পরিবারেরও তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না (অবশ্যই প্রচলিত মুসলমান প্রচলিত হিন্দু বা প্রচলিত বৌদ্ধ খৃষ্টান অর্থে )। লোকটি যদি একটি অমানুষ হয়, কুমানুষ হয়, বে-মানুষ হয় ‘যেমনটি হয়ে থাকে, হয় হচ্ছে’  ঘুষখোর জোচ্চর প্রতারক খুনি লোভী হিংসুটে প্রতিহিংসাপরায়ন অসভ্য সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান অঞ্চল সমাজ এমনকি গোটা রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয় অসুস্থ হয় অধপতিত হয়। এবং অবশ্যই বলার অপেক্ষা রাখেনা যে খোদ ওই বদ মানুষটি পথভ্রষ্ট লোকটি  তার নিজ পরিবারের কষ্ট যন্ত্রনা ও ক্ষতির কারন হয় এবং নিজেও হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত। বলাবাহুল্য প্রকৃত মুসলমান, প্রকৃত হিন্দু, প্রকৃত বৌদ্ধ বা খৃষ্টান যিনি হন তিনি এসবের উর্ধে। কারন তিনি বা তারা আসলে কার্যত নিজ ধর্মের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে যথার্থই একজন মানুষ হয়ে উঠেন। কিন্তু ও বলে কোন লাভ নেই। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা থেকে (আমার জানার সুযোগ হয়েছিলো) বাংলাদেশী একজন প্রবাসী মুসলমান দেশে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছিলেন ‘অষ্ট্রিয়াতে ইসলাম আছে মুসলমান নেই আর বাংলাদেশে মুসলমান আছে ইসলাম নেই’। সতের কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে পনের কোটির উপর জন্ম সূত্রে মুসলমান। কোন এক দেশে দিনের বেলায় হারিকেন জ্বালিয়ে হাতে নিয়ে ঘুরতে থাকা এক লোককে কৌতুহলি এক লেখক জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘ আপনি দিনের বেলায় হারিকেন জ্বালিয়ে ঘুরছেন কেন? উত্তরে লোকটি বললো আমি খুঁজছি। আরও বিস্ময়ে লেখক জিজ্ঞেস করলেন খুঁজছেন? কি খুঁজছেন? লোকটি নির্বিকারে উত্তর দিলেন মানুষ খুঁজছি। ‘কোরআনের লন্ঠন নিয়ে’ বাংলাদেশে (যেহেতু বাংলাদেশ নিয়েই কথা হচ্ছে) ঘরে ঘরে গিয়ে ক’জন ‘কুরানিক মুসলমান’ পাওয়া যাবে তার হিসাব মনে হয় কম্পিউটারে বা খাতায় লিখে নয়, অঞ্চল ভেদে  আঙ্গুলে গুনেই করা যাবে। 

কি ধারণ করছি আমরা ?

অপর এক লেখক তার এক লেখায় জানিয়েছিলেন বাজার করতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে তিনি টের পান তার পিঠে কেউ একজন হাত বুলিয়েছে। তিনি যখন পেছন ফিরে তাকালেন দেখলেন স্বাভাবিক পোষাক পরা মাঝ বয়সি একজন লোক ততক্ষনে তার কাছ থেকে সরে অন্য আরেকজনের পিঠে হাত দিচ্ছেন। তিনি আরও লক্ষ্য করে দেখেন তিনি একই কাজ আরও কয়েকজনের ক্ষেত্রে করছেন। লেখক  তখন বাজার করা রেখে ওই লোকের পিছে পিছে ঘুরে এক পর্যায়ে তাকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনি মানুষের পিঠে হাত দিচ্ছেন কেন? লোকটি উত্তরে বললো দেখছিলাম মেরুদন্ড আছে কিনা। হতভম্ব লেখক তখন জিজ্ঞেস করলেন কি দেখলেন, পেলেন? লোকটি দুঃখি ভাব নিয়ে বললেন, না একজনও না। নবী মোহাম্মদ কে মানদন্ড করে সেই মানদন্ডে যাচাই করতে গেলে ক’জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে আমি মুসলমান! দূরবীন বা অনুবীক্ষণ যন্ত্র লাগবে সেরূপ মুসলমান খুঁজে পেতে। ধর্ম পোষাকে নয়, আচার-অনুষ্ঠান নয়। জন্মগত পরিচয় বা নামে বা পদ পদবিতে নয়, এমনকি শুধু পালনেও নয়। ধর্ম ধারন করার বিষয় লালন করার বিষয় এবং সেই সাথে পালন করার বিষয়। আর সেখানেই প্রশ্ন হচ্ছে ‘ধারণ’টা কি করছি আমরা ? মুসলমানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে কোরআন কে কি ধারণ করছি? কোরআনের শিক্ষা কে কি ধারণ করছি? রাসুল  কে কি ধারণ করছি? রাসুল এর চরিত্র চারিত্রিক গুনাবলী  কি ধারণ  করছি? না কি ধারণ করছি, করে চলেছি  লোভ ঘৃণা হিংসা বিদ্বেষ পরশ্রীকাতরতা কিংবা বর্বরতা বা নৃশংসতাকে।

নামে মুসলমান কামে নয় !

আমার ফেইসবুকের কমেন্ট বক্সে আরেকজন প্রশ্ন করেছেন আপনি মুসলমান হলে আপনার নাম সাগর সগীর কেন? তিনি যা বুঝাতে চেয়েছেন তার অর্থ দাঁড়ায় সগীর না হয় বুঝলাম ‘মুসলমান শব্দ’ অর্থাৎ আরবী শব্দ কিন্তু সাগর? এতো  হিন্দু, হিন্দুয়ানা শব্দ। অর্থাৎ আমাদের অজ্ঞতা কতদূর পর্যন্ত  কত গভীর পর্যন্ত যে  শব্দও হয়ে, গেছে নামও হয়ে গেছে ধর্মীয় পরিচিতির কারন । কমেন্ট বক্সেই তাৎক্ষনিকভাবে উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলাম এখানে তা  একটুবিশদে বলছি । জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম ‘ মুসলিম দেশ’ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি অবশ্যই মুসলমান, যার নাম ছিলো মেঘবতী সুকর্ণ পুত্রী। এরকম কয়েকটি নয় লক্ষ লক্ষ নয় কোটি কোটি ইন্দোনেশিয়ানদের পাওয়া যাবে যাদের নাম  এই ধরনের । তাদের কে  কি প্রশ্ন করা যাবে আপনি কি হিন্দু?, এই ইন্দোনেশিয়ারই রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহনের নাম ‘গারুর’। যা কিনা সনাতন ধর্মের ভগবান বিষ্ণুর বাহন (একটি পাখি)। ওদের লোগোতেও তার ছাপ রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় মুদ্রার নাম রূপীয়া যাতে ছাপ রয়েছে হিন্দু দেবতা শ্রী গণেশের। এই দুই প্রসঙ্গ তুলে এক বিদেশি সাংবাদিক ইন্দোনেশিয়ার এক মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলো যে আপনারা মুসলিম দেশ হওয়া সত্তেও আপনাদের মুদ্রায় কেন হিন্দু দেবতা গণেশের ছবি? কিংবা ভগবান বিষ্ণুর বাহন গারুর এর নামে কেন আপনাদের রাষ্ট্রীয় এয়ার লাইন্স এর নাম? একই সাথে তিনি এও বুঝাতে চেয়েছিলেন হিন্দুদের নামে কেন তাদের নাম অথবা তাদের সংস্কৃতিতে হিন্দুত্বের ছাপ। উত্তরে ওই মন্ত্রী গম্ভীরভাবে বলেছিলেন ‘We had changed our religion not our ancesters’ বাংলায় যা অর্থ দাড়াঁয় আমরা আমাদের ধর্ম বদল করেছিলাম, আমাদের পূর্ব পুরুষদের নয়। অর্থ্যাৎ পরিস্কার করে বললে উনি যা বুঝাতে চেয়েছিলেন তার অর্থ দাঁড়ায় ইন্দোনেশিয়ানরা তাদের পূর্ববর্তী ধর্ম (সনাতন ধর্ম) ছেড়ে এসেছেন, তাদের পূর্ব পুরুষদের নয় । অর্থ্যাৎ পূর্ব পুরুষদের কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে  (চলতি পরিচয়ে যা সনাতনী)  তারা ছেড়ে আসেননি। 

এটাই সঠিক। এটি মোটেও  ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। ইসলাম পূর্ববর্তী আরব আর ইসলাম পরবর্তী আরবেও এর ভূড়ি ভূড়ি নজির পাওয়া যায়। খোদ আরবের শেখরা গর্ব করে বলে থাকে, ‘First we are Arabian  than Muslim’। অর্থ্যাৎ,’ প্রথমে আমরা আরবীয় তারপর মুসলমান’। যার মানে দাঁড়ায় প্রথম যদি মুসলমানিত্বকে সামনে নিয়ে আসা হয়, এই পরিচয়ই যদি হয় প্রথম এবং এটিকে (মুসলমানিত্বকে) বড় পরিচয় হিসাবে যদি গ্রহন করে নেয়া হয় তাহলে চৌদ্দশ বছরেই  আটকে যাবে আরবের ইতিহাস আরবের অহংকার।  মুছে যাবে তার কয়েক হাজার বছরের অতীত ঐতিহ্য  অর্থ্যাৎ, ইসলাম – পূর্ব অতীত গর্ব, তার যুগ যুগের সমৃদ্ধ  পরম্পরা। 

এসব প্রশ্ন যারা ফেইসবুকে উত্থাপন করেন তাদের মুসলমানিত্বের ধ্যান ধারণার আড়তদার হলো দেশের কথিত ধর্মীয় নেতারা (পড়ুন ধর্মজীবিরা)। আরও সঠিক শব্দে বলতে হয়  ধর্মব্যবসায়ীরা – যাদের ধর্মীয় শিক্ষার সূতিকাগার হচ্ছে মাদ্রাসা। আর এই  মাদ্রাসা শিক্ষার প্রচলন করেছিলো মুসলমান উদ্যোগক্তারা নয় (তৎকালীন মুসলিম নেতারা),  এদেশে  মাদ্রাসা শিক্ষার প্রচলন ঘটিয়েছিলো ‘খৃষ্টান ইংরেজ’। তারচেয়েও ভয়ংকর তথ্য কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার (যার উত্তরসূরী ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা) প্রথম দিককার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে দেখা গেছে খৃষ্টান পাদ্রী (যারা মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত নয়!)। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কক্ষে আজও যে কেউ প্রবেশ করে দেয়ালের বোর্ডে টানানো প্রাক্তন অধ্যক্ষের তালিকাটা দেখে নিন প্রথমজন থেকে কতজন খৃষ্টান (পাদ্রী) এর নাম রয়েছে সেখানে। ‘খৃষ্টান’ পাদ্রীদের নেত্তৃত্বে পরিচালনায় ‘খৃষ্টান’ বৃটিশদের সুপরিকল্পিত নীল নকশায় প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রমের ফসল এই মাদ্রাসা ব্যবস্থা। যার ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে উঠে আমাদের মুসলমানিত্বের ধ্যান ধারনা।

জল নয় পানি দাদা নয় ভাই – 

বাংলাদেশে ‘একটু জল খেতে দিন ‘ যদি কেউ বলে তার দিকে বাঁকা চোখে না হলেও ভ্রু কুচকে একজন মুসলমান বাংলাদেশী তাকাবে। মুখে জিজ্ঞেস করে বসতে পারে, না হলে মনে মনে অন্তত প্রশ্ন  তুলবে ‘লোকটা হিন্দু নাকি’? ‘দাদা’ সম্বোধন করলেও ফলাফল একই !  ভারতে আনুমানিক  ছয় কি সাত কোটি বাঙ্গালি হিন্দু ‘পানি’ বলে না, বলে ‘জল’। ‘ভাই’ বলে না বলে ‘দাদা’। বাংলাদেশের হিন্দুরাও একই অবস্থা। বিপরিতে বাংলাদেশের মুসলমানরা ব্যবহার করে ‘পানি’ ও ‘ভাই’। অর্থ্যাৎ ‘পানি’ ও ‘ভাই’  হলো মুসলমানী শব্দ। বিস্ময়কর হচ্ছে ভারতের ৮০-৯০ কোটি হিন্দীভাষী হিন্দু ব্যবহার করে দৈনন্দিন কথায় লেখায় সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে (জল নয়) ‘পানি’,( দাদা নয়) ‘ভাই’। এরূপ আরও ভূড়ি ভূড়ি শব্দ রয়েছে যা ধর্মজীবি ধর্ম ব্যবসায়ীদের মতলবী প্রচারনায় বাংলাদেশে সাধারনভাবে মুসলমানদের কাছে পরিচিতি পেয়ে আসছে মুসলমানি শব্দ বলে। ৬ থেকে ৮ কোটি (এপার বাংলা ওপার বাংলা মিলিয়ে)  বাংলাভাষী হিন্দুর  ব্যবহৃত শব্দ হয়ে গেল ‘হিন্দু শব্দ’  আর, ৮০- ৯০ কোটি  হিন্দি ভাষী হিন্দুর ব্যবহৃত শব্দ হয়ে আছে মুসলমান শব্দ (নির্বুদ্ধীতা কাকে বলে, চিন্তা ভ্রষ্টতা কাকে বলে !) ।

কেউ ধূতি পরলে (অবশ্যই বাংলাদেশে) অপরিচিত হলে তাকে কোন বাংলাদেশী মুসলমান (ব্যতিক্রম ছাড়া)  নিশ্চিত ধরে নিবেন লোকটি হিন্দু। আর যদি তা কোন পরিচিত মুসলমানকে পরতে দেখা যায় তাহলে হাতে মারমুখি না হলেও জ্বিহ্বায় মারমুখি হয়ে উঠবেন  ‘ধর্ম – অনুভূতি’ (আসলে অধর্ম অনুভূতি) জেগে উঠা ঐ বাংলাদেশী মুসলমানদের। অথচ যুগ যুগ ধরে ধুতি ছিলো বাঙ্গালীর (কি মুসলমান বাঙ্গালী কি হিন্দু বাঙ্গালীর) প্রিয় পোশাক, ঐতিহ্যর পোশাক। আমার ব্যক্তিগত পারিবারিক তথ্য থেকে বলতে পারি আমার দাদা (বাবার বাবা) মৌলভী মোশাররফ হোসেন ছিলেন কোলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে গোল্ড ম্যাডেল সহ সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত, যশস্বী ধর্মীয় শিক্ষক হিসাবে এবং নামজাদা ধর্মীয় নেতা হিসাবে বড় মাপের আলেম হিসাবে আমাদের গোটা অঞ্চলে ছিলো তাঁর বহুল পরিচিতি ব্যপক সুখ্যাতি। তিনি প্রায়ঃশই পরিধান করতেন এই ‘হিন্দু ধুতি’ যা পড়ে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় বক্তৃতা (ওয়াজ) করতেন। আফসোস আজ ধুতি হয়ে গেছে হয়ে আছে হিন্দু পোষাক !

পরিশেষে, আমি জানি নিশ্চিত করেই জানি ‘হিন্দু হওয়া’ যায় না, কারও পক্ষে ‘হিন্দু হওয়া’ সম্ভবও না। আমি এও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি আমার ধর্মচ্যুতি ঘটেনি। আমি স্বধর্মেই স্থিত আছি  এবং থাকবো, থাকবো আমৃত্যু।