আইএস সৃষ্টিতে মার্কিন ভূমিকার বাস্তব চিত্র

IsI

সংলাপ ॥ গত দুই দশকে বিশ্বে নজিরবিহীনভাবে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে উগ্র সন্ত্রাসবাদের কবলে পড়ে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে পড়েছে আর এর সুযোগ নিচ্ছে সা¤্রাজ্যবাদী আমেরিকা। সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে আমেরিকা এ অঞ্চলের দেশগুলোকে হয় দখল করার চেষ্টা করছে অথবা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে।

উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ তথা আইএস আমেরিকারই সৃষ্টি অথচ তারাই আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে এবং গোটা অঞ্চলকে নিরাপত্তাহীনতা ও উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লুউ বুশ সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে ব্যাপক হামলা চালিয়ে ইরাক ও আফগানিস্তান দখল করে। ইরাক দখলের পর উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ বা আইএসএর উদ্ভব ঘটে। এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইরাক ও সিরিয়ায় ইতিহাসের ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং ধর্ষণ, লুটতরাজসহ নানা অপরাধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গোলযোগ শুরুর পরপরই আমেরিকা ও তার মিত্ররা সিরিয়ার বৈধ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য আইএস নামক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে তোলে এবং তাদেরকে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর আমেরিকা সন্ত্রাসীদেরকে ভাল ও মন্দ এ দু’টি ভাগে ভাগ করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে তারাই কেবল ভাল সন্ত্রাসী যারা কিনা ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। নিঃসন্দেহে আইএস আমেরিকারই সৃষ্টি। কারণ শুরু থেকেই আইএস সন্ত্রাসীরা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। আমেরিকার নির্দেশেই আইএস সিরিয়ার বৈধ সরকার উৎখাতের জন্য বহু হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এরা আমেরিকার দৃষ্টিতে ভাল সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে, আমেরিকার দৃষ্টিতে কেবল তারাই খারাপ সন্ত্রাসী যারা বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করছে এবং দখলদার ইসরাইলের মতো মিত্রদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামি জিহাদ আন্দোলনের মতো সংগঠনগুলোকে আমেরিকা খারাপ সন্ত্রাসী বলে মনে করে।

সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে সাবেক প্রেসিডেন্টদের মতো বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছেন।

একদিকে, তিনি উগ্র তাকফিরি বা আইএসের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ও তাদের প্রধান অর্থের যোগানদাতা সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন দিচ্ছেন অন্যদিকে এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে লড়াই করার ও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন। সৌদি আরবের সহযোগিতায় উগ্র ওয়াহাবি মতাদর্শ থেকে আইএস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে যার পেছনে আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এসবই সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে আমেরিকার দ্বিমুখী নীতির প্রমাণ। খ্যাতনামা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইভান ইপোলিতোভ বলেছেন, “গত বেশ ক’বছর ধরে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদকে এমনভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে যাতে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়ে অন্য দেশকে দুর্বল করা যায়।”

প্রকৃতপক্ষে, ওয়াহাবি মতবাদের ওপর ভিত্তি করে উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের জন্ম হলেও এ ব্যাপারে মার্কিন দ্বিমুখী নীতির কারণেই মূলত এর বিস্তার ঘটেছে। যতদিন পর্যন্ত আমেরিকা ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো আইএস সন্ত্রাসীদেরকে তাদের স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার বলে মনে করবে এবং এদের প্রতি সমর্থন দিতে থাকবে ততদিন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী এ ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিস্তার ঘটতে থাকবে।

২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে আরব বিশ্বে ইসরাইল ও স্বৈরসরকার বিরোধী ব্যাপক গণজাগরণ শুরু হওয়ার পর সেই জাগরণকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য বেশ কয়েকটি দেশে আইএস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে মাঠে নামানো হয়। এ প্রসঙ্গে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা যায়। আমেরিকা, ইসরাইল ও সৌদি আরবের সহযোগিতায় সিরিয়া আইএস সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। পাশ্চাত্য ও তাদের আরব মিত্ররা সিরিয়া সরকারের পতন ঘটানোসহ এ অঞ্চলে তাদের বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য আইএসকে ব্যবহার করছে। অর্থ ও অস্ত্র পেয়ে এ গোষ্ঠীটি প্রচুর সমর্থক যোগাড় করতে সক্ষম হয় এবং অল্প সময়ে বহু জায়গা দখল করে নেয়।

আইএস’র হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য আরব বিশ্বে পাল্টা গণবাহিনী গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়ায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আইএস প্রথমে ইরাকের সাদ্দাম সমর্থক নিষিদ্ধঘোষিত বাথ পার্টির সদস্য ও সৌদিপন্থী উগ্র ওয়াহাবি সালাফিদের সমর্থনে গঠিত হয় এবং খুব দ্রুত তারা সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে ও বহু জায়গা দখল করে নেয়। আমেরিকা ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা সিরিয়ায় সংকটের শুরু থেকেই সন্ত্রাসীদেরকে ভাল ও খারাপ এ দু’টি ভাগে বিভক্ত করে। তারা আইএসকে ভাল সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে সর্বাত্মক সাহায্য-সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখে। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল আইএস সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটানো।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের সময় দায়েশ সৃষ্টিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের হাত থাকার কথা জানিয়েছিলেন।

এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ আরো অনেক দেশের রাষ্ট্র প্রধানরাও আইএস সৃষ্টিতে সরাসরি হোয়াইট হাউজের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেও আইএস সন্ত্রাসীদের প্রতি মার্কিন সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে সিরিয়া সরকারের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে রাশিয়া সেদেশে সেনা মোতায়েন করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন পশ্চিম এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদের বিস্তারের জন্য মার্কিন আগ্রাসন ও স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ী করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সামরিক তৎপরতা ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের বিস্তারের প্রধান কারণ।

আইএস বিরোধী তথাকথিত আন্তর্জাতিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু তারা আদৌ সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে চায় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ সিরিয়ায় মার্কিন কর্মকান্ডে প্রমাণিত হয়েছে আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তারা সন্ত্রাসীদেরকে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছে। ২০১৪ সালের পর আইএস বিরোধী যে আন্তর্জাতিক জোট গঠিত হয়েছে তার মাধ্যমে আমেরিকা আইএস সন্ত্রাসীদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়েছে। আমেরিকা লোক দেখানো আইএস বিরোধী তৎপরতা চালালেও তারাই এ সন্ত্রাসী সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছে। এমনকি যুদ্ধে পরাজিত আইএস সন্ত্রাসীদেরকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে আমেরিকা। ইরাক ও সিরিয়া থেকে পলাতক আইএস সন্ত্রাসীরা এখন আফগানিস্তানে গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে এবং সেখানেও তারা আমেরিকার সমর্থনে তৎপরতা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে আফগানিস্তানের সরকার ও জনগণ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।