অসম বাঙালি কি বিদেশি?

ashom bangali

সংলাপ ॥ নতুন করে আরও ১,০২,৪৬২ জন অসমবাসীকে খসড়া নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) থেকে বহিষ্কার করা হল। গত বছর ৩০ জুলাই ৪০,০৭,৭০৭ জন অসমবাসীকে এনআরসির বাইরে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৬ লক্ষ খসড়াছুট লোক গত ১৫/২২ জুন পর্যন্ত ‘শুনানি’, ‘বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট’ ইত্যাদি নিয়ে এই জেলা থেকে ওই জেলায় দফায় দফায় ছোটাছুটি করেছেন। এখন নতুন করে এই ১,০২,৪৬২ জন লোক ছোটাছুটি আরম্ভ করবেন। ১১ জুলাইয়ের মধ্যেই এই নতুন খসড়াছুট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় দস্থাবেজ জমা দিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় তারা বিদেশি বলে প্রমাণিত হবেন এবং তাদের ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে।

আগের দফার খসড়াছুটদের মধ্যে প্রায় ৪ লক্ষ লোক নিজেদের নাগরিকত্বের সপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেশ করতে পারেননি। তাদের গায়ে বিদেশি ছাপ পড়েই গেছে। এবার আরও ১,০২,৪৬২ জন সম্ভাব্য বিদেশি। তাদের বন্দি রাখতে নতুন, বিপুলায়তন ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। যে প্রক্রিয়া ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে, অসম রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সাহায্যে হয়ে চলেছে। বাঙালিদের গায়ে নির্বিচারে বিদেশি লেবেল সেঁটে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প এর নামে জেলার জেলগুলিতে ভরে দেওয়া হচ্ছে। আইনের ধারা উপধারা দেখিয়ে বলা হচ্ছে, যারা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পরে পূর্ব পাকিস্থান বা বাংলাদেশ থেকে অসমে প্রবেশ করেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে, কেবল তাদেরই ট্রাইবুনালের বিচারে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’এ পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্থব পরিস্থিতি অন্যরকম। এমন অনেককে ক্যাম্পে ভরা হয়েছে, যারা দেশের প্রচলিত আইনের কোনও ধারা বা সংজ্ঞাতেই বিদেশি বলে বিবেচিত হতে পারেন না। কারণ, তাদের অনেকের মা, বাবা, দাদু দিদার নাম ১৯৫১ সালের এনআরসি, বা তারও আগের কোনও দস্থাবেজে আছে। এঁরা যথার্থ ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু ডিটেনশন ক্যাম্পে রয়েছেন। অনারারি ক্যাপ্টেন সানাউল্লাহর মতো একজন প্রাক্তন ভারতীয় সেনা আধিকারিককেও বর্ডার পুলিশ ও ট্রাইবুনালের চক্করে পড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পের হীন আবাসিক হয়ে অসম্মানজনক মানসিক ও শারীরিক যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। এমনকী কীর্তিমান বর্ডার পুলিশ এক মধুবালার বদলে অন্য মধুবালাকে বিদেশি সাজিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করে রেখে দিয়েছে। অথচ, দুই মধুবালাই নাকি যথার্থ ভারতীয়! এক্ষেত্রে বর্ডার পুলিশ যেন কুটিল ষড়যন্ত্রকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে! আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে গঠিত রাজ্য সরকার নিছকই অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র!

ইতিহাসের সূচনা থেকেই বাঙালি রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হাজার হাজার বছর ধরে বাঙালি কামরূপ রাজ্যের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী। বাঙালি বসতিপূর্ণ শ্রীহট্ট, ময়মনসিংহ, ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর সেই প্রাচীন যুগ থেকেই দফায় দফায় কামরূপ রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়েছিল। এই তত্ত্ব বা তথ্য অনুযায়ী বাঙালি হিন্দু প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের আদি বাসিন্দা রূপে বর্তমান অসম প্রদেশের স্থায়ী ভূমিপুত্র। বাঙালি বুদ্ধিজীবী তথা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই ঐতিহাসিক তত্ত্বটি আদালতে এবং সংসদে ও বিধানসভায় যুক্তিতর্ক সহকারে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন রয়েছে। হাজার হাজার বছরের ভূমিপুত্র বাঙালি কখনই বিদেশি হতে পারে না।

ইতোমধ্যে বোঝাও গেছে যে ওই ৪০ লক্ষের বেশিরভাগ মানুষই যথার্থ ভারতীয় নাগরিক এবং এদের অধিকাংশই বাঙালি হিন্দু। তাদের অধিকাংশই ‘নাগরিক পঞ্জি’তে অন্তর্ভুক্তির জন্য পুনরায় দাবি পেশ করেছেন।  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেদনকারীদের অজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় দলিল প্রদর্শনের ব্যর্থতা হেতু  বা, সাধারণ ভুল ত্রুটিতে তাদের নাম এই ড্রাফট থেকে বাদ পড়ে গেছে। ১৯৫৬ সালে প্রদত্ত ‘নাগরিকত্ব প্রমাণপত্র’ থাকা সত্ত্বেও কারও কারও নাম নাগরিক পঞ্জিতে শামিল হয়নি। এনআরসি সেবা কেন্দ্রে গিয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে জানা গেল যে নাগরিকের হাতে থাকা সরকারি আধিকারিকের স্বাক্ষর ও কার্যালয়ের সিলমোহর যুক্ত ‘নাগরিকত্ব প্রমাণ পত্র’এর রেকর্ড নাকি সরকারি দপ্তরে পাওয়া যায়নি। প্রমাণ পত্রটি ভেরিফিকেশনে পাঠানোর পর  মন্তব্য এসেছে ‘রেকর্ড নট অ্যাভেলেবল’। সরকারের ঘরে রেকর্ড না থাকার জন্য প্রমাণপত্র থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় নাগরিকের নাম খসড়া নাগরিক পঞ্জিতে সামিল হল না।

এই পরিস্থিতিতে বিচার করতে হচ্ছে, বাঙালি কি যথার্থই ‘বিদেশি’? বাঙালিকে এই সব বিশেষণে ভূষিত করা কি যথোচিত? অখন্ড ভারতভূমির আদি ও অকৃত্রিম বাসিন্দা বাঙালি কীভাবে একজন ‘ঘুসপেটিয়া’ হতে পারে? কীভাবে ‘উইপোকা’ হতে পারে! হাজার হাজার বছর ধরে ভারতভূমির বাসিন্দা বাঙালি কীভাবে কোন রাজ্য সরকারের চোখে ‘প্রাইমাফেসি ফরেনার’ হতে পারে!