অশুভ শক্তির ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র রাজনীতি আর চায় না জাতি

অশুভ শক্তির ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র

রাজনীতি আর চায় না জাতি

শেখ উল্লাস ॥ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ধর্মকে সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করে অশুভ শক্তি সমাজ জীবনে কী ধরনের অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে ভোলার বোরহানউদ্দিন সাম্প্রতিক ঘটনাবলী একটি নতুন উদাহরণ মাত্র। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যখন একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে, সরকারের কর্মকান্ডে মানুষের আস্থা বাড়ছে তখন ভোলায় ধর্মের নামে আবারও অরাজকতা ও প্রাণহানির ঘটনায় জাতির বিবেক স্তব্ধ। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে অশুভ শক্তি এক এক সময়ে এক এক ভাবে তাদের অশুভ চরিত্র প্রকাশ করে। নয় বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অবৈধ শাসক জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র সেই নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হয় এরশাদেরই পূর্বসূরী এবং প্রায় একই আদর্শের অনুসারী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি। যে-দুটি দলের জন্ম ও চেতনার সাথে এদেশের শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ইতিহাসের, ভাষা আন্দোলন-স্বাধীকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের কোনো সম্পর্কই ছিলো না। জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তা এখন দিবালোকের মতোই স্পষ্ট সত্যানুসন্ধানী মানুষদের কাছে। আর এরশাদ সাহেব তো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান থেকে তিন বার বাংলাদেশে আসেন, ঢাকা হয়ে রংপুরে যান আত্মীয়-পরিজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তার কাছে কোনো আবেদনই সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং, এরশাদ ছিলেন পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত যেসব বাঙালি সৈনিক-কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাদের বিচারের জন্য গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান।

ফলে বলা চলে, জিয়া-এরশাদ দু’জনই দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবধারাকে ধ্বংস করে এখানে পাকিস্তানী আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তৎপর ছিলেন এবং এটাই স্বাভাবিক। যদিও জিয়ার চাইতে এরশাদের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা-ছাত্র-শ্রমিক-হত্যার ঘটনা অপেক্ষাকৃত অনেক কম ছিল। তার শাসনামলে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো হলেও পূর্বসূরী জিয়াউর রহমানের মতোই ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে এদেশের রাজনীতিকদের চরিত্র নষ্ট করার চেষ্টা তার কোনো অংশেই কম ছিলো না।

এরশাদবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে এদেশের কত ছাত্রের জীবন যে নষ্ট হয়েছে, তার হিসাব কেউ রাখেনি। তবু আশা ছিল এরশাদের পতনের পর নতুন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন-ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। সে জন্য স্বাভাবিকভাবেই আশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় আসবে, বঙ্গবন্ধু হত্যা, জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার হবে। কিন্তু ১৯৯০’এর গণআন্দোলনে সে বছর ৬ই ডিসেম্বর এরশাদ পতনের তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি ক্ষমতায় চলে আসে, যা তখন ছিলো একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সেদিন বিএনপির ক্ষমতায় আসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির নতুন করে যাত্রা শুরু হলেও তাদের পাকিস্তান-প্রীতি নতুন করে চাঙ্গা হয়েছিল। জামাতের আমির গোলাম আজমকে তারা নাগরিকত্ব দেয়। ডাকসুসহ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখে। সাংবাদিকদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিউইজে)কে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙ্গে দেয়া হয় যার কুফল আজও ভুগতে হচ্ছে দেশকে। এইসব কান্ড- দেশের সামগ্রিক মূল্যবোধের ওপরই  আঘাত হানে যার ধারাবাহিকতা আজও চলছে । ওই সময় (১৯৯২) শহীদ-জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত গঠন করে গোলাম আজমের ফাঁসির রায় দেয়া না হলে, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের পাকিস্তানপ্রীতি আরও যে কত দূর অগ্রসর হতো তা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখার বিষয়।

১৯৯৬ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তারপর নির্দলীয় সরকারের অধীনে ১২ই জুনের নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার পর দেশ পাকিস্তানী ভাবধারার অন্ধকারের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে-এ কথা আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়। ১৯৭৫ সালের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ রাষ্ট্রযন্ত্র তখন থেকেই সক্রিয় হয়। আবার ২০০১ সালের অক্টোবরে সেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়া বিএনপি-জামায়াত জোট এদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কী ভয়াবহ জঙ্গীপনা, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছিল তার নীরব স্বাক্ষী এদেশের সচেতন ও বিবেকবান সমাজ। এই ভয়াবহতার পরিণতি হিসেবে দেশে সংঘটিত হয় ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা ‘এক এগারো’র ঘটনাবলী। এই ‘এক এগারো’ সংঘটিত না হলে বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতীরা আরেকটি গণহত্যা সংঘটিত করতো, দেশের অসাম্প্রদায়িক সকল শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতো। অবশেষে ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভরাডুবির মধ্য দিয়ে দেশ আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন কৌশল-অপকৌশলে বিএনপি-জামায়াত জোটকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার মাধ্যমে অত্যন্ত শক্ত হাতে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা তার স্বীকৃতি আজ বিশ্বজুড়ে।

কিন্তু তাঁর দলের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে জামায়াত-বিএনপি-ফ্রিডম পার্টিসহ কত দুষ্কৃতিকারীর যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে তার সর্বশেষ দৃশ্যপট জাতির সামনে ভেসে উঠেছে গত মাস থেকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর। বস্তুত: ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে না পারলে রাজনীতিতে এমন দুর্বৃত্তায়ন হয়তো নাও হতে পারতো।  সেদিন নির্বাচনের ফলাফলে স্তম্ভিত হয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সংবাদ-সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘অগণতান্ত্রিক শক্তি নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি করেছে। ঢাকা মহানগরীতে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে অশুভ শক্তি সফল হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা একই অবস্থার সৃষ্টি করে নির্বাচনের প্রত্যাশিত ফলাফলকে উল্টে দিয়েছে। আমরা ন্যায় ও সত্যের জন্য সংগ্রাম করেছি। ষড়যন্ত্র চালিয়ে এই সংগ্রামকে নস্যাৎ করা যাবে না’।  তিনি আরও বলেছিলেন, ‘স্বৈরশাসনের পতনের পর অর্জিত বিজয়কে সংহত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছিল নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনকে সত্যিকারভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য আমরা নির্বাচন আচরণবিধি মেনে চলার এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতা বজায় রাখার আহবান জানিয়েছি। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো গোপন আঁতাতের মাধ্যমে নানাবিধ কার্যকলাপ পরিচালনা করেছে। ভিত্তিহীন, মিথ্যা প্রচারণা করেছে এবং অসত্যের আশ্রয় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনে সুবিধাভোগী ও ষড়যন্ত্রকারীরা কালো টাকা আর অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে একটি জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অশুভ গোপন আঁতাত ও চক্রান্তের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে নস্যাৎ করেছে। এই চক্রান্ত দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খাকেই শুধু বানচাল করেনি, গণতন্ত্রেও ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিৎ করে তুলেছে। এটা জাতির জন্য শুভ ফলাফল কোনভাবেই বয়ে আনতে পারে না। গত ১৫ বছরের ন্যায় মানুষের ভোট, ভাত ও মৌলিক মানবাধিকার অশুভ শক্তির বলয়ে বন্দী হয়ে পড়বে’। ( তথ্যসূত্র:, দৈনিক সংবাদ, ২ মার্চ, ১৯৯১)।

গণতন্ত্রহীন ওই ১৫ বছরের সাথে আরও ৬ বছর যোগ হয়ে তা মোট ২১ বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়েছিল। জিয়া-এরশাদ-খালেদার ওই সময়টিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুর নামটিকেই নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুঃখজনক ও দুভার্গ্যজনক দিকটি হচ্ছে, দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পরেও আবার ৯১’ সালে নির্বাচিত হয়ে খালেদা জিয়াই ক্ষমতায় আসীন হন এবং ৭৫-পরবর্তী ধাঁচে সে একই কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে।    বিএনপি গণতান্ত্রিক শক্তি নয় বলেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে রেখেছিল। হত্যাকান্ড, ষড়যন্ত্র এবং সূক্ষ্ম কারচুপির আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া কোনো গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে কখনো সম্ভব হয় না। এই বিএনপি যে গণতান্ত্রিক শক্তি নয় তার আরেকটি বড় প্রমাণ পরপর তিন দফায় দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারেনি। তাই ধর্ম, ধর্মজীবী, ধর্মান্ধ এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, দেশি-বিদেশি অশুভ শক্তির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে তারা একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ের যেসব তথাকথিত নেতার সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে তাদের সবগুলোর সাথেই এরশাদের যুবসংহতি, খালেদা জিয়ার যুবদল, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সংগঠন ফ্রীডম পার্টির যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে। এইসব অশুভ শক্তি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সরকারকে গণবিচ্ছিন্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু এটা যে সদ্য-স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ১৯৭৪-১৯৭৫ সাল নয়। এটা ২০১৯ সাল। শত-সহস্র বাঁধাবিপত্তি পার হয়ে, জীবনের ওপর সকল হুমকিকে মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্তি টানতে দেশকে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁরই রক্তের উত্তরাধিকার দেশরতœ শেখ হাসিনা। গুটি কয়েক দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের মদদে অশুভ শক্তি ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যার এই মহান প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দেবে-তা বাংলার মাটিতে আর হতে দেয়া যায় না। শান্তিপ্রিয়, বিবেকবান, সচেতন, ধার্মিক জনগণ চায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহৎ উদ্যোগগুলো সফল হোক।